আপনার হৃৎপিণ্ড কতটা সুস্থ জানবেন যে উপায়ে
ব্যায়াম করার পর হৃদস্পন্দন কত দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তা থেকে হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যসহ শরীরের সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়। ব্যায়াম শেষে এক মিনিটে হৃদস্পন্দন কতটা কমছে, তা পরিমাপের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগের ঝুঁকি এবং অকালমৃত্যুর আশঙ্কা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর বিবিসির
হৃদস্পন্দন পুনরুদ্ধার বা হার্ট রেট রিকভারি (এইচআরআর) হলো ব্যায়ামের সময় হৃদস্পন্দনের হার এবং ব্যায়াম শেষ করার প্রায় এক মিনিট পরের হৃদস্পন্দনের হারের পার্থক্য। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গ্রসম্যান স্কুল অব মেডিসিনের হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ নিয়াকা গোল্ডবার্গের মতে, এইচআরআর হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির সুস্থতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এটি উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগজনিত জটিলতার ঝুঁকি নির্ণয়েও সহায়ক হতে পারে।
তবে এই পরীক্ষার গুরুত্ব শুধু হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়ামের পর হৃদস্পন্দন ধীরে স্বাভাবিক হওয়া শরীরের অন্য কিছু স্বাস্থ্যসমস্যারও আগাম সংকেত হতে পারে। এমনকি এটি একজন মানুষের সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের গবেষকেরা এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেন। এতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হৃদস্পন্দন পুনরুদ্ধারের হার পরীক্ষা করে ছয় বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, যাঁদের হৃদস্পন্দন পুনরুদ্ধারের হার কম ছিল, তাদের গবেষণার সময়কালে মৃত্যুর ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি ছিল।
পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষণাতেও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে। হৃদ্যন্ত্রে দৃশ্যমান কোনো সমস্যা না থাকলেও এইচআরআর যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। তরুণ ও মধ্যবয়সীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গে এর সম্পর্ক উচ্চ রক্তচাপের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে।
কীভাবে মাপবেন হৃদস্পন্দন পুনরুদ্ধারের হার
এই পরীক্ষা করার জন্য একটি টাইমার, তথ্য লিখে রাখার ব্যবস্থা এবং সম্ভব হলে স্মার্টওয়াচ বা ফিটনেস ট্র্যাকার প্রয়োজন। তবে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ব্যায়ামের সময় মাথা ঘোরা, বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভব করা কিংবা ব্যায়ামের তুলনায় অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হবে। আগে থেকে হৃদ্রোগ থাকলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া এ পরীক্ষা করা উচিত নয়।
প্রথমে নিজের সর্বোচ্চ হৃদস্পন্দনের হার সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। সাধারণভাবে বয়সকে ২২০ থেকে বিয়োগ করে একটি আনুমানিক হিসাব পাওয়া যায়। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে নির্ভুল নয়। স্মার্টওয়াচ বা অন্য কোনো পর্যবেক্ষণযন্ত্রেও এ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এরপর নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী এমন ব্যায়াম করতে হবে, যাতে হৃদস্পন্দন সর্বোচ্চ হারের প্রায় ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশে পৌঁছায়। দৌড়ানো, সাইকেল চালানো বা রোয়িংয়ের মতো ব্যায়াম করা যেতে পারে।
ব্যায়াম শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে হৃদস্পন্দন মাপতে হবে। স্মার্টওয়াচ বা ফিটনেস ট্র্যাকার থাকলে তা ব্যবহার করা যায়। অন্যথায় ঘাড়ের পাশে আঙুল রেখে ১০ সেকেন্ডে স্পন্দন গুনে সংখ্যাটিকে ছয় দিয়ে গুণ করলে প্রতি মিনিটের আনুমানিক হৃদস্পন্দন পাওয়া যাবে।
এরপর এক মিনিট বসে বা শুয়ে বিশ্রাম নিয়ে আবার হৃদস্পন্দন মাপতে হবে। ব্যায়াম শেষ করার পরপর পাওয়া হৃদস্পন্দন থেকে এক মিনিট পরের হৃদস্পন্দন বাদ দিলেই পাওয়া যাবে এইচআরআর।
এক মিনিটে কতটা কমা ভালো
ব্যায়ামের পর হৃদস্পন্দন যত দ্রুত কমে স্বাভাবিক অবস্থার দিকে ফিরে আসে, সাধারণভাবে তা তত ভালো লক্ষণ। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যায়াম শেষ করার প্রথম মিনিটে হৃদস্পন্দন অন্তত ১৮ বার কমাকে ভালো পুনরুদ্ধারের একটি নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে এই সংখ্যা বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, ব্যায়ামের ধরন ও তীব্রতা এবং বিশ্রামের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। কিছু পরিস্থিতিতে এক মিনিটে হৃদস্পন্দন ১২ বারের কম কমলে তা স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে শুধু এই সংখ্যা দিয়ে কোনো রোগ নির্ণয় করা যায় না।
হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হতে দেরি হয় কেন
ব্যায়ামের পর হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে ভেগাস নার্ভের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এই স্নায়ু মস্তিষ্কের সঙ্গে হৃদ্যন্ত্র, যকৃৎ, অন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের যোগাযোগে ভূমিকা রাখে। এটি শরীরের উত্তেজনা ও চাপের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিশ্রাম এবং হজমের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রমেও ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাজ্যের হার্টফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক লিন্ডসে বটমস বিষয়টি বোঝাতে হৃদ্যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে গাড়ির ব্রেক ও অ্যাক্সিলারেটরের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ব্যায়ামের সময় সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়। এতে শরীরের ‘লড়াই বা পালানোর’ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং পেশিতে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়াতে রক্তনালি প্রসারিত হয়।
ব্যায়াম বন্ধ করার পরও শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় তৈরি ল্যাকটিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন পদার্থের ব্যবস্থাপনা এবং পেশির স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার জন্য কিছু সময় বেশি রক্তপ্রবাহ ও অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। এ কারণে হৃদস্পন্দন সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হয় না।
পরবর্তী সময়ে প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে শরীরকে বিশ্রামের অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। নিয়মিত ব্যায়ামের ফলে শরীরের এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন করার সক্ষমতা উন্নত হতে পারে। একে ভেগাল টোনের উন্নতির সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়।
উন্নত ভেগাল টোনের সঙ্গে ভালো মানসিক স্বাস্থ্য, চিন্তা ও স্মৃতিসংক্রান্ত সক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং শরীরে প্রদাহ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এটি সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি কম থাকার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
হৃদস্পন্দন পুনরুদ্ধারের হার বাড়াবেন যেভাবে
হৃদস্পন্দন পুনরুদ্ধারের হার নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করানো উচিত। তবে নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে এইচআরআর উন্নত করা সম্ভব বলে গবেষণায় দেখা গেছে। এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও কমতে পারে।
নিয়াকা গোল্ডবার্গ ও লিন্ডসে বটমস নিয়মিত হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকারী ব্যায়াম করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, মাঝারি গতিতে হাঁটা, সাইকেল চালানো, জগিং, দৌড়ানো কিংবা সাঁতার কাটার মতো কার্যক্রম হৃদ্যন্ত্রের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নাচও একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
তবে ব্যায়ামের তীব্রতা নিজের বয়স ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। হৃদস্পন্দন পুনরুদ্ধারের হার একটি সহায়ক স্বাস্থ্যসূচক—এটি এককভাবে সুস্থতা বা অসুস্থতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।