২৩ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৩৯

মুত্রথলির ক্যান্সার, সতর্ক হবেন যেসব লক্ষণ দেখলে

প্রতীকি ছবি  © সংগৃহীত

প্রস্রাবে রক্ত দেখা দেওয়া কিংবা ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়াকে অনেকে সাধারণ সংক্রমণ ভেবে অবহেলা করেন। তবে এসব উপসর্গ মূত্রথলির ক্যানসারেরও লক্ষণ হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পুরুষদের মধ্যে এ ক্যানসার বেশি দেখা গেলেও নারীরাও আক্রান্ত হতে পারেন।

মূত্রথলি কিডনি থেকে আসা প্রস্রাব জমা রাখে এবং পরে শরীর থেকে বের করে দেয়। মূত্রথলির টিস্যুর কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে শুরু করলে ক্যানসার তৈরি হতে পারে। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে রোগটি আশপাশের টিস্যু এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

মূত্রথলির ক্যানসারের ধরন

মূত্রথলির ভেতরের আবরণে থাকা কোষ থেকে সাধারণত এই ক্যানসারের উৎপত্তি হয়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ইউরোথেলিয়াল কারসিনোমা, যা ট্রানজিশনাল সেল কারসিনোমা নামেও পরিচিত। এ ছাড়া স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা, অ্যাডেনোকারসিনোমা, স্মল সেল কারসিনোমা ও সারকোমার মতো বিরল ধরনও রয়েছে।

ক্যানসার মূত্রথলির ভেতরের আবরণে সীমাবদ্ধ রয়েছে, নাকি পেশি ও আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়েছে—তার ওপর রোগের জটিলতা ও চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ভর করে।

যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন

মূত্রথলির ক্যানসারের কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ হলো—

- প্রস্রাবে রক্ত দেখা দেওয়া। কখনো প্রস্রাবের রং লাল বা বাদামি হতে পারে, আবার কখনো পরীক্ষায় রক্ত ধরা পড়ে।
- স্বাভাবিকের তুলনায় ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া।
- প্রস্রাবের ধারা থেমে থেমে আসা।
- প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হওয়া।

রোগটি অগ্রসর হলে কোমর বা পিঠে ব্যথা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, পা ফুলে যাওয়া, হাড়ে ব্যথা এবং প্রস্রাব করতে না পারার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

তবে এসব লক্ষণ মানেই ক্যানসার নয়। মূত্রনালির সংক্রমণসহ বিভিন্ন রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। প্রস্রাবে রক্ত দেখা দিলে, বিশেষ করে তা একবারের জন্য হলেও, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

মূত্রথলির ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট কারণ সব ক্ষেত্রে জানা যায়নি। তবে কোষের জিনগত পরিবর্তন রোগটি সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। ধূমপান এ ক্যানসারের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। তামাকের ক্ষতিকর রাসায়নিক রক্তের মাধ্যমে কিডনিতে পৌঁছায় এবং প্রস্রাবের সঙ্গে মূত্রথলিতে জমা হতে পারে।

এ ছাড়া বয়স বাড়া, নির্দিষ্ট শিল্পকারখানার রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ, দীর্ঘস্থায়ী মূত্রথলির প্রদাহ, আগে কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি নেওয়া এবং পারিবারিক ইতিহাস ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সাধারণত ৫৫ বছরের বেশি বয়সিদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়। নারীদের তুলনায় পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেশি।

যেভাবে শনাক্ত করা হয়

রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ ও চিকিৎসার ইতিহাস জানেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয়।

সিস্টোস্কোপির মাধ্যমে ক্যামেরাযুক্ত সরু নল দিয়ে মূত্রথলির ভেতর দেখা হয়। সন্দেহজনক টিস্যু পাওয়া গেলে বায়োপসির জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হতে পারে। এ ছাড়া প্রস্রাব পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান এবং অন্যান্য ইমেজিং পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসারের অবস্থান ও বিস্তার নির্ণয় করা হয়।

চিকিৎসা

ক্যানসারের ধরন ও পর্যায়, রোগীর বয়স এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে। চিকিৎসায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ, প্রয়োজনে মূত্রথলির অংশ বা পুরোটা অপসারণ, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি ব্যবহার করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বিসিজি থেরাপিও দেওয়া হয়।

চিকিৎসার পর ক্যানসার আবার ফিরে আসতে পারে। তাই নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলোআপ জরুরি। ধূমপান ত্যাগ করা এবং কর্মক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হলেও এটি এককভাবে মূত্রথলির ক্যানসার প্রতিরোধের নিশ্চয়তা দেয় না।

আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, মূত্রথলির ক্যানসার মূত্রথলির ভেতরের আবরণে সীমাবদ্ধ থাকলে পাঁচ বছর আপেক্ষিক বেঁচে থাকার হার প্রায় ৯৫ শতাংশ। তবে ক্যানসার শরীরের দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে এই হার প্রায় ১৫ শতাংশে নেমে আসে। এসব পরিসংখ্যান রোগীর ব্যক্তিগত ফলাফলের নিশ্চয়তা দেয় না।