চাকা না থাকলেও ত্বকের যেসব পরিবর্তনে মিলতে পারে স্তন ক্যান্সারের ইঙ্গিত
স্তন ক্যান্সার মানেই যে স্তনে চাকা বা কঠিন কিছু জমে যাওয়া, এ ধারণাটা সবসময় ঠিক নয়। অনেক সময় স্তনের ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, ফুলে ওঠা কিংবা কমলালেবুর খোসার মতো হয়ে যাওয়াও হতে পারে এই রোগের প্রাথমিক সংকেত। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে স্তনে কোনো চাকা বা পিণ্ড না থাকলেও ত্বকের এমন পরিবর্তন দিয়েই ক্যান্সার শুরু হয়। তাই স্তনে চাকা নেই ভেবে নিশ্চিন্ত না থেকে, ত্বকের যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
২০২৪ সালে প্রকাশিত ত্বক ও স্তন ক্যান্সার বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় বিষয়টি বেশ জোরালোভাবে উঠে এসেছে। সেখানে আগের বিভিন্ন ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় ছয় থেকে দশ শতাংশ স্তন ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রে ত্বকের এই পরিবর্তনগুলোই ছিল রোগের প্রথম লক্ষণ। অবশ্য সবার ক্ষেত্রে বা সব এলাকার মানুষের ক্ষেত্রে এই হার এক রকম হয় না, তবে গুরুত্ব দেওয়ার মতো যথেষ্ট বড় একটি অংশ এতে আক্রান্ত হন।
ত্বকের যেসব পরিবর্তনে সতর্ক হবেন
স্তন ক্যান্সারের উপসর্গ একেকজনের শরীরে একেকভাবে প্রকাশ পায়। স্তনের ত্বক, আকার বা বোঁটায় নতুন কোনো পরিবর্তন দেখলে তাই বাড়তি সতর্ক থাকা ভালো।
ত্বকের রঙে বদল: স্তনের ত্বক হঠাৎ লালচে, গোলাপি বা বেগুনি হয়ে যাওয়া কিংবা শরীরের অন্য কোথাও আঘাত না লাগলেও কালচে বা কালশিটের মতো দাগ পড়া।
কমলালেবুর খোসার মতো ভাব: ত্বক অতিরিক্ত পুরু হয়ে যাওয়া, কিছুটা ফুলে ওঠা কিংবা ছোট ছোট গর্তের মতো ডেম্পল তৈরি হওয়া।
আকারে পরিবর্তন: একটা স্তন হঠাৎ করেই আগের চেয়ে ফুলে যাওয়া বা অন্যটার তুলনায় দৃশ্যমান বড় হয়ে যাওয়া।
বোঁট পরিবর্তন: এতদিন স্বাভাবিক থাকা স্তনবৃন্ত বা বোঁটা ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া কিংবা এর আশপাশের ত্বকে অদ্ভুত কোনো পরিবর্তন দেখা দেওয়া।
দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বা ফুসকুড়ি: স্তনের ত্বকে কোনো ক্ষত বা ঘা তৈরি হওয়া যা সহজে সারতে চায় না, কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে র্যাশ বা চুলকানির মতো সমস্যা থাকা।
অবশ্যই এর মানে এই নয় যে এমন লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যান্সার হয়েছে। সাধারণ কোনো সংক্রমণ বা চর্মরোগেও এমন হতে পারে। তবে নিজের শরীরে নতুন কোনো পরিবর্তন দেখলে নিজে থেকে অনুমান না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
যে ক্যান্সারে স্তনে চাকা থাকে না
চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে ইনফ্ল্যামেটরি ব্রেস্ট ক্যান্সার বলা হয়, যা স্তন ক্যান্সারের বেশ বিরল কিন্তু অত্যন্ত আক্রমণাত্মক একটি ধরন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে স্তন ক্যান্সারের মোট রোগীর প্রায় এক থেকে পাঁচ শতাংশ এই ধরনের সমস্যায় ভোগেন।
এই ক্যান্সার কোষে আক্রান্ত হলে সেগুলো স্তনের ত্বকের ভেতরের লসিকানালিগুলো বন্ধ করে দেয়। ফলে স্তন খুব দ্রুত ফুলে ওঠে, ত্বক লাল হয়ে যায় এবং কমলালেবুর খোসার রূপ নেয়।
মজার বা ভয়ের বিষয় হলো, এতে ভেতর থেকে কোনো শক্ত চাকা হাত দিয়ে বোঝা যায় না। এমনকি সাধারণ ম্যামোগ্রামেও অনেক সময় এটি ধরা পড়তে চায় না। তাই ম্যামোগ্রাম রিপোর্ট স্বাভাবিক আসলেও যদি ত্বকে এমন অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, তবে তা অবহেলা করা যাবে না।
ক্যান্সারের চিকিৎসায়ও বদলাতে পারে ত্বক, চুল ও নখ
শুধু রোগের লক্ষণ হিসেবেই নয়, ক্যান্সারের বিভিন্ন চিকিৎসা চলার সময়ও শরীরের ত্বক, চুল ও নখে নানা বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ব্রাজিলের একটি গবেষণায় ১৫২ জন রোগীর ওপর চিকিৎসা চলাকালীন তথ্য নিয়ে দেখা হয়েছিল, তাঁদের প্রায় ৯৪ শতাংশের ক্ষেত্রেই ত্বক, চুল বা নখসংক্রান্ত কোনো না কোনো সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এর মধ্যে একটা বড় অংশ চুল পড়ে যাওয়ার যন্ত্রণার কথা জানিয়েছেন।
অন্য খবর: তৃতীয় ভাষা শেখাতে শিক্ষার্থীদের মতামত নেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
বিশেষ করে কেমোথেরাপির প্রভাবে চুল পড়ে যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। আবার রেডিওথেরাপি বা সেঁক নেওয়ার কারণে যে জায়গায় চিকিৎসা চলে, সেখানকার ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, শুষ্ক হয়ে যাওয়া কিংবা জ্বালাপোড়া করার মতো সমস্যা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে সঠিক যত্ন নিতে হয়, মনমতো কোনো মলম বা প্রসাধনী ব্যবহার করলে উল্টো ক্ষতি হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
স্তনের ত্বকে নতুন কোনো লালচে ভাব, ফোলাভাব, ত্বক পুরু হয়ে যাওয়া, বোঁটা ভেতরে ঢুকে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখলে দেরি না করে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বা ভালো কোনো চিকিৎসকের কাছে যান। বিশেষ করে একটি স্তনে যদি খুব দ্রুত এমন পরিবর্তন চোখে পড়ে, তবে আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।
চিকিৎসক পরিস্থিতি বুঝে সাধারণ শারীরিক পরীক্ষা, আলট্রাসাউন্ড, ম্যামোগ্রাম বা বায়োপসি করানোর কথা বলতে পারেন। সাধারণ কোনো ইনফেকশনের চিকিৎসা নেওয়ার পরও যদি সমস্যা না কমে, তবে অবশ্যই পুনরায় পরীক্ষা করানো দরকার।