১০ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৩৭

পরিবেশের সঙ্গে মানুষের শরীরেও ছড়াচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, ঝুঁকি কতটা?

মানুষের শরীরেও ছড়াচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক  © এআই সম্পাদিত

বর্তমানে প্লাস্টিক দূষণ শুধু সমুদ্র ও পরিবেশের জন্যই হুমকি নয়, এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। মানুষের রক্ত, ফুসফুস ও প্রজননতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা যাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয় তার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। 

এসব কণা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখনো পুরোপুরি জানা না গেলেও বিভিন্ন গবেষণায় রক্তনালির রোগ, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও প্রদাহজনিত রোগের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের এক প্রতিবেদনে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দূষণ কমানোর উপায় তুলে ধরা হয়েছে। পরিবেশ, প্রজনন ও নারীস্বাস্থ্যবিষয়ক সহকারী অধ্যাপক শ্রুতি মাহালিঙ্গাইয়া বলেন, শুধু প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে এ দূষণ মোকাবিলা সম্ভব নয়। এর ব্যবহার কমানো এবং উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা জরুরি।

শরীরের বিভিন্ন অংশে মিলছে প্লাস্টিকের কণা
সাধারণত পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। বড় প্লাস্টিকের বস্তু ভেঙে কিংবা বিভিন্ন পণ্যের ব্যবহার ও ক্ষয়ের ফলে এসব কণা তৈরি হয়। খাবার, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে এগুলো মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

গবেষণায় মানবদেহের বিভিন্ন অংশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি গর্ভফুল, অণ্ডকোষ ও বীর্যের নমুনাতেও এসব কণা শনাক্ত হয়েছে। তবে শরীরে এসব কণার উপস্থিতি পাওয়া মানেই এগুলোর কারণে নির্দিষ্ট কোনো রোগ হচ্ছে, এমন নয়। মাইক্রোপ্লাস্টিকের ধরন, আকার ও রাসায়নিক গঠনের ভিত্তিতে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণায় রক্তনালির রোগ, ক্যানসার, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগের মতো সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় উঠে এসেছে। স্নায়বিক উপসর্গ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তবে এসব রোগের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্পর্ক কতটা প্রত্যক্ষ, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শরীরের কোথায় পৌঁছাতে পারে এবং সেখানে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, তা জানা জরুরি। পাশাপাশি প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কী প্রভাব ফেলে, সেটিও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পুনর্ব্যবহার হয় মাত্র ৯ শতাংশ প্লাস্টিক
প্লাস্টিক দূষণ কমাতে পুনর্ব্যবহারকে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিশ্বে উৎপাদিত প্লাস্টিকের মাত্র প্রায় ৯ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয় বলে হার্ভার্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি প্লাস্টিকের বড় অংশ বর্জ্য ভূমিতে জমা হয়, পুড়িয়ে ফেলা হয় কিংবা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে ব্যবহারের পর প্লাস্টিক সংগ্রহের পাশাপাশি শুরু থেকেই এর ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

গাড়ির টায়ার ও কাপড় থেকেও ছড়ায় দূষণ
প্লাস্টিক দূষণের উৎস শুধু বোতল বা প্যাকেট নয়। গাড়ির টায়ার রাস্তার সঙ্গে ঘর্ষণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ক্ষুদ্র কণা ছড়ায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, টায়ারের ক্ষয় থেকে তৈরি কণা সমুদ্রে পৌঁছানো প্লাস্টিকের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশের জন্য দায়ী হতে পারে। পোশাক, বিছানার চাদরসহ বিভিন্ন বস্ত্রপণ্য থেকেও ক্ষুদ্র তন্তু ছড়িয়ে পড়ে। ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধোয়ার সময় এসব তন্তু বিচ্ছিন্ন হয়ে বর্জ্যপানির সঙ্গে পরিবেশে মিশতে পারে।

এ ধরনের দূষণ কমাতে ওয়াশিং মেশিনে মাইক্রোফাইবার আটকানোর ফিল্টার ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করে গণপরিবহন বেছে নেওয়া এবং কাছাকাছি দূরত্বে হেঁটে যাওয়াও সহায়ক হতে পারে।

চিকিৎসাসেবায়ও কমাতে হবে প্লাস্টিক বর্জ্য
হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের সামগ্রীর ব্যবহার ব্যাপক। বিশেষজ্ঞের মতে, সাধারণ অস্ত্রোপচারেও এক ব্যাগ বা তার বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা অস্ত্রোপচারে তা ছয় ব্যাগ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

তাই রোগীর নিরাপত্তা ও সংক্রমণ প্রতিরোধের বিষয়টি অক্ষুণ্ন রেখে চিকিৎসাসেবায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো জরুরি। নিরাপদে জীবাণুমুক্ত করে পুনরায় ব্যবহার করা যায় এমন যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। 

দূষণ কমাতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ
মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কমাতে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সরকার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পুনর্ব্যবহারের ওপর নির্ভর না করে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা এবং নিরাপদ বিকল্প খুঁজে বের করাই এ দূষণ মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ পথ।