বিষণ্নতা কমাতে খাদ্যতালিকায় আনুন যে পরিবর্তন
আমরা প্রতিনিয়ত যে খাবার খায় সেটা শুধু আমাদের শরীরের উপর নয় প্রভাব পড়ে মনেও। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, কোমল পানীয় কিংবা সসেজের মতো অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি থাকলে তা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব খাবার খাওয়ার পরিমাণ কমালে বিষণ্নতা বা এর উপসর্গ কমতে পারে।
সম্প্রতি 'জামা সাইকিয়াট্রি' সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় ২০ জনের উপর এ গবেষণা পরিচালিত হয়। তাদের মধ্যে ১৯ জন গবেষণাটি সম্পন্ন করেন। অংশগ্রহণকারীরা একসময় নিজেদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন, অন্য সময় অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে দেন। দুই পর্যায়ের তুলনায় দেখা যায়, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়ার সময় তাঁদের বিষণ্নতা ও উদ্বেগের উপসর্গ তুলনামূলক কম ছিল। তবে গবেষণাটি ছোট পরিসরে হওয়ায় বিষয়টি নিশ্চিত হতে আরও বড় গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে। তাদের বিষণ্নতা শনাক্ত হয়েছিল, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা ছিল বেশি এবং অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি থাকা কিংবা ইনসুলিন প্রতিরোধের মতো অন্তত একটি বিপাকীয় সমস্যা ছিল। গবেষণার সময় অংশগ্রহণকারীদের ওষুধ গ্রহণ, থেরাপি, ব্যায়াম ও ঘুমের অভ্যাস অপরিবর্তিত রাখতে বলা হয়।
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোর পর্যায়ে তারা এসব খাবার খাওয়া ৮৫ শতাংশের বেশি কমিয়ে আনেন। বিষণ্নতা পরিমাপের বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি ‘পেশেন্ট হেলথ কোয়েশ্চেনেয়ার-৯’ (পিএইচকিউ-৯) অনুযায়ী, স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের সময় অংশগ্রহণকারীদের গড় স্কোর ছিল ৮ দশমিক ৬৮। অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়ার পর্যায়ে তা কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৫৩-তে।
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কেন উদ্বেগের?
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার বলতে শিল্পকারখানায় তৈরি এমন খাবারকে বোঝায়, যেগুলোতে খাবার থেকে নিষ্কাশিত বা প্রক্রিয়াজাত উপাদানের পাশাপাশি এমন কিছু উপাদান ও সংযোজক ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণত ঘরোয়া রান্নায় ব্যবহৃত হয় না। কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ক্যান্ডি, সসেজ, হট ডগ পেস্ট্রি, ফ্রাইড জাতীয় খাবার ইত্যাদি। তবে সব প্রক্রিয়াজাত খাবারই অস্বাস্থ্যকর নয়। খাবার প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে কি না, শুধু এ বিবেচনায় এর পুষ্টিগুণ বিচার করাও ঠিক নয়।
গবেষণায় অংশ না নেওয়া প্রিভেন্টিভ কার্ডিওলজি ডায়েটিশিয়ান মিশেল রাউথেনস্টাইন বলেন, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোর ফলে বিষণ্নতার উপসর্গ সরাসরি কমে কি না, নাকি সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের অন্য পরিবর্তনও এতে ভূমিকা রাখে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
খাবারের সঙ্গে মনের সম্পর্ক কোথায়
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কীভাবে মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে গবেষকেরা কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখছেন। এ ধরনের খাবারে অনেক সময় আঁশ, ভিটামিন ও খনিজের পরিমাণ কম থাকে। অথচ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য এসব পুষ্টি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। কিছু অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারে থাকা কৃত্রিম মিষ্টিকারক অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে স্নায়বিক ও জৈবিক যোগাযোগ রয়েছে। একে বলা হয় ‘গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস’। অন্ত্রের অণুজীবের ভারসাম্য, শরীরের প্রদাহ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে মানসিক অবস্থার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা চলছে।
গবেষণায় অংশ না নেওয়া মনোবিজ্ঞানী দারা হাউপের মতে, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খাওয়ার কারণে ফলমূল ও শাকসবজির মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ কমে যেতে পারে। এতে শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ার আশঙ্কা থাকে। কিছু গবেষণায় বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা কম এবং অক্সিডেটিভ ক্ষতির সূচক বেশি থাকার সম্পর্কও দেখা গেছে।
খাদ্যাভ্যাসে আনবেন যেসব পরিবর্তন
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমাতে একবারেই সবকিছু বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যেসব খাবার বেশি থাকে, সেগুলো দিয়েই পরিবর্তন শুরু করা যেতে পারে।
প্রতিদিন চিনিযুক্ত পানীয় পান করলে তার বদলে পানি বেছে নেওয়া যেতে পারে। প্যাকেটজাত স্ন্যাকসের পরিবর্তে খাওয়া যেতে পারে ফল, বাদাম বা সাধারণ টক দই। পাশাপাশি ঘরে রান্না করা খাবার এবং ফলমূল, শাকসবজি, শস্য ও চর্বিহীন প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।
সুবিধাজনক খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। হিমায়িত শাকসবজি, কৌটাজাত শিম ও মাছ, ওটস, সাধারণ টক দই এবং টোফুর মতো খাবার স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত, সব ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবার বাদ দেওয়া নয়; বরং ধীরে ধীরে খাদ্যতালিকায় আঁশ, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ বাড়ানো।
প্রয়োজন আরও গবেষণা
গবেষণাটির কয়েকটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল কম। খাদ্যাভ্যাসের তথ্যের জন্য তাঁদের নিজেদের দেওয়া বিবরণের ওপরও নির্ভর করতে হয়েছে। এ ছাড়া খাবার কমানোর কোন দিকটি উপসর্গের পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি।
তাই শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলেই বিষণ্নতা দূর হবে, এমনটি শতভাগ মনে করার দরকার নেই। বিষণ্নতার উপসর্গ দেখা দিলে খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।
সূত্র: হেল্থলাইন