আগরবাতি বা মশার কয়েলের ধোঁয়ায় কি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ঘরে সুগন্ধ ছড়ানো কিংবা মশা তাড়াতে অনেকেই নিয়মিত আগরবাতি ও মশার কয়েল ব্যবহার করেন। তবে এসব পণ্য পোড়ানোর সময় তৈরি হওয়া ধোঁয়া নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। ধোঁয়ার সঙ্গে সূক্ষ্ম কণা ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা শ্বাস নেওয়ার সময় শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এসব ধোঁয়া কি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির সঙ্গে আলাপকালে এইচওসি বেদান্তের মেডিকেল অনকোলজিস্ট ডা. চিন্তন শাহ বলেন, মাঝেমধ্যে বাড়িতে আগরবাতি বা মশার কয়েল ব্যবহারের কারণে সরাসরি ক্যানসার হয়—এমন দাবির পক্ষে বর্তমানে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তবে এসব পণ্য পোড়ানোর কারণে ঘরের ভেতরের বাতাসের মান খারাপ হতে পারে। বিশেষ করে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা কম থাকলে ধোঁয়ার সংস্পর্শ বেশি হতে পারে।
আগরবাতি জ্বালানোর ফলে শুধু সুগন্ধই ছড়ায় না, দহনের সময় বাতাসে সূক্ষ্ম কণা ও বিভিন্ন গ্যাসীয় পদার্থও মিশে যায়। এর মধ্যে উদ্বায়ী জৈব যৌগ এবং পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনের মতো উপাদান থাকতে পারে। তবে মাঝেমধ্যে আগরবাতি ব্যবহার করলেই ক্যানসার হবে—এমনটা বলা যায় না। ক্যানসারের পেছনে জিনগত কারণ, তামাক, অ্যালকোহল, কিছু সংক্রমণ, স্থূলতা ও পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে মশার কয়েল ধীরে ধীরে পুড়ে মশা তাড়ানোর উপাদান বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে এর দহনের ফলে ধোঁয়া ও অতি সূক্ষ্ম কণাও তৈরি হয়। ডা. শাহের মতে, একজন ব্যক্তি কতটা ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসছেন, তা কয়েলের উপাদান, ব্যবহারের পরিমাণ, ঘরের আকার এবং বাতাস চলাচলের ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।
তাই বড় ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গার তুলনায় ছোট ও বন্ধ ঘরে কয়েল ব্যবহার করলে ধোঁয়ার সংস্পর্শ বেশি হতে পারে। বিশেষ করে একই ঘরে দীর্ঘ সময় অবস্থান বা ঘুমানোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে এমন জোরালো প্রমাণ নেই যে, মাঝেমধ্যে আগরবাতি বা মশার কয়েল ব্যবহারের কারণে সরাসরি ক্যানসার হয়। তবে কিছু গবেষণায় দীর্ঘসময় আগরবাতির ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকার সঙ্গে শ্বাসতন্ত্রের ক্যানসারের সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। মশার কয়েলের ধোঁয়া শ্বাসতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলেও কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ডা. শাহ বলেন, এসব গবেষণা সম্ভাব্য একটি যোগসূত্রের ইঙ্গিত দিলেও গৃহস্থালির এসব পণ্য ও ক্যানসারের মধ্যে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিত করে না। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এছাড়া ঘরে আগরবাতি বা কয়েল জ্বালালে ঘরে ধোঁয়া কতটা জমবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে বাতাস চলাচলের ওপর। জানালা-দরজা বন্ধ থাকা অবস্থায় আগরবাতি বা কয়েল ব্যবহার করলে ধোঁয়া ও বিভিন্ন কণা সহজে বাইরে বের হতে পারে না। ফলে ঘরের বাতাসে এসব উপাদানের ঘনত্ব বাড়তে পারে। তাই কেউ যদি ওই ঘরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন, তাহলে ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকার সময়ও বেড়ে যায়।
ওই সময় দমবন্ধ বা শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি এড়াতে কয়েকটি বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. শাহ। যেমন—
বাতাস চলাচলের ভালো ব্যবস্থা আছে এমন জায়গায় আগরবাতি জ্বালানো।
সম্ভব হলে জানালা বা দরজা খোলা রাখা।
একসঙ্গে অনেকগুলো আগরবাতি না জ্বালানো।
অপ্রয়োজনে দীর্ঘ সময় আগরবাতি জ্বালিয়ে না রাখা।
দীর্ঘ সময় অবস্থান বা ঘুমানোর বদ্ধ ঘরে আগরবাতি কিংবা কয়েলের ধোঁয়া জমতে না দেওয়া।
সব মিলিয়ে, মাঝেমধ্যে আগরবাতি বা মশার কয়েল ব্যবহারে সরাসরি ক্যানসার হয়—এমন প্রমাণ বর্তমানে নেই। তবে ঘরের বাতাসের মান ভালো রাখতে এবং ধোঁয়ার সংস্পর্শ কমাতে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।