০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০০

যে ৭ অভ্যাস ফুসফুসের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়

শ্বাসযন্ত্র   © সংগৃহীত

বয়স কম, কিন্তু ফুসফুস যেন বুড়িয়ে যাচ্ছে—এমনটা মনে হওয়ার পেছনে শুধু সংক্রমণ বা রোগ দায়ী নয়। প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসও ধীরে ধীরে ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। ধূমপান থেকে শুরু করে দূষিত বাতাসে চলাফেরা, দিনের বেশির ভাগ সময় বসে থাকা কিংবা প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার মতো অভ্যাস শ্বাসযন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, তামাকের ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।

ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে গেলে শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসে শব্দ হওয়া কিংবা অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ফুসফুস কতটা ভালোভাবে কাজ করছে, তা নির্ণয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে স্পাইরোমেট্রি পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষায় ফুসফুস কতটা বাতাস ধারণ করতে এবং কতটা দ্রুত বাতাস বের করতে পারছে, তা পরিমাপ করা যায়।

প্রতিদিনের কোন অভ্যাসগুলো ফুসফুসের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে, চলুন জেনে নেওয়া যাক।

ধূমপান

ফুসফুসের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর অভ্যাসগুলোর একটি ধূমপান। সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক শ্বাসনালি ও ফুসফুসে প্রদাহ তৈরি করে এবং দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ফুসফুসের টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে। ধূমপান দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ, বিশেষ করে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি)-এর অন্যতম প্রধান কারণ।

ধূমপান চালিয়ে গেলে ফুসফুসের ক্ষতি দ্রুত বাড়তে পারে। তাই ফুসফুস সুস্থ রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো ধূমপান না করা বা ধূমপান করলে তা ছেড়ে দেওয়া।

পরোক্ষ ধূমপান

নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একে পরোক্ষ ধূমপান বলা হয়। এর কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)। এমনকি অল্প সময়ের সংস্পর্শেও শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।

দীর্ঘদিন পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা এবং ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই বাড়ি, কর্মস্থল বা অন্য কোনো জায়গায় ধূমপানের ধোঁয়া থেকে নিজেকে দূরে রাখা জরুরি।

মাস্ক না পরে দূষিত জায়গায় যাওয়া

রাস্তায় চলাচলের সময় যানবাহনের ধোঁয়া, ধুলাবালি ও বিভিন্ন দূষিত কণা নিয়মিত শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। কলকারখানার ধোঁয়া ও রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শও শ্বাসযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। WHO বলছে, বায়ুদূষণ শ্বাসযন্ত্রের রোগ তৈরি ও বিদ্যমান রোগ বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই অতিরিক্ত দূষিত পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকা এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ধুলা, ধোঁয়া বা রাসায়নিকের মধ্যে কাজ করা ব্যক্তিদের বাড়তি সতর্ক থাকা উচিত।

বদ্ধ ঘরে দীর্ঘ সময় থাকা

আলো-বাতাস কম ঢোকে এমন বদ্ধ ঘরে দীর্ঘ সময় থাকলেও শ্বাসযন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। ঘরের ভেতরে রান্নার ধোঁয়া, তামাকের ধোঁয়া, মশার কয়েল বা অন্যান্য জ্বালানি থেকে তৈরি ধোঁয়া জমে গেলে বাতাসের মান খারাপ হয়।

WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণও সিওপিডিসহ বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রের রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। বিশেষ করে অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল থাকলে রান্নার ধোঁয়া ও অন্যান্য দূষিত কণার সংস্পর্শ বেড়ে যায়।

তাই ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রাখা এবং রান্নার ধোঁয়া বের হওয়ার জন্য কার্যকর বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি।

দিনভর বসে কাজ

শারীরিকভাবে সক্রিয় না থেকে দিনের বেশির ভাগ সময় বসে থাকা শুধু ওজন বা হৃদ্‌যন্ত্রের ওপরই প্রভাব ফেলে না; দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক সক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক।

WHO দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাই দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে কাজের ফাঁকে হাঁটা বা সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম করার অভ্যাস করা ভালো।

প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া

সর্দি-কাশি হলেই নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার অভ্যাসও ক্ষতিকর হতে পারে। সব ধরনের সর্দি-কাশি বা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বারবার অ্যান্টিবায়োটিক খেলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির ঝুঁকি বাড়ে।

তাই সর্দি-কাশি বা অন্য কোনো শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা হলে নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কোনো সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হলে চিকিৎসকই এর ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করবেন।

পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া

শরীরে পানির ঘাটতি হলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। শ্বাসনালিতে থাকা মিউকাসও শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অংশ। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ শরীরের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

তবে শুধু বেশি পানি খেলেই ফুসফুসের সব রোগ প্রতিরোধ করা যায়—এমন ধারণা ঠিক নয়। ফুসফুস ভালো রাখতে ধূমপান এড়িয়ে চলা, বায়ুদূষণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং শ্বাসযন্ত্রের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ফুসফুসের কার্যকারিতা বয়সের সঙ্গে কিছুটা কমতে পারে। তবে ধূমপান, পরোক্ষ ধূমপান, বায়ুদূষণ ও দীর্ঘদিনের অনিয়মিত জীবনযাপনের মতো ঝুঁকি কমানো গেলে ফুসফুসকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখার সুযোগ বাড়ে। দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ বা অল্প পরিশ্রমেই অতিরিক্ত হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।