দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন পেতে আজ থেকেই গড়ে তুলুন ৭ অভ্যাস
আপনি খেয়াল করলে দেখবেন সিনেমার নায়ক-নায়িকা কিংবা খেলোয়াড় তাদের অধিকাংশই দীর্ঘদিন সুস্থ ও ফিট থাকেন, তাদের অনেকের বয়স ৫০ পার হলেও মনে হয় যেন ৩০ বছরের কোনো মানুষ। অপরদিকে অনেক সাধারণ মানুষের বয়স ৪০ না পেরোতেই শরীরে বয়সের ছাপ ও নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হন। এটা কেনো হয়? এটা মূলত হয় দৈনন্দিন জীবনযাপনের অভ্যাসের উপর।
এর পেছনে অবশ্য বংশগত কারণ থাকলেও সবকিছু জিনের ওপর নির্ভর করে না। প্রতিদিন কী খাচ্ছেন, কতটা হাঁটছেন, কেমন ঘুমাচ্ছেন কিংবা মানসিক চাপ কীভাবে সামলাচ্ছেন এসব অভ্যাসও দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে কিছু অভ্যাস মেনে চলতে পারেন-
১. খাবারে নিয়মিত উদ্ভিজ্জ রাখুন
দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে খাবারের তালিকায় উদ্ভিজ্জ খাবারের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে। ফল, সবজি, ডাল, বাদাম, বীজ ও গোটা শস্য নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস শরীরের জন্য উপকারী। গবেষণায় উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের সঙ্গে হৃদ্রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই খাবারের পাতে শুধু স্বাদের দিকে নয়, বৈচিত্র্য ও পুষ্টির দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
২. শরীরকে বসিয়ে রাখবেন না
সুস্থ শরীরের জন্য নিয়মিত নড়াচড়া জরুরি। ব্যায়াম ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি মেজাজ ভালো করতে, ঘুমের মান বাড়াতে এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম অথবা ৭৫ মিনিট জোরালো ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর সঙ্গে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করা ভালো। তবে ব্যায়াম মানেই জিমে যাওয়া নয়। নিয়মিত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কিংবা পছন্দের কোনো খেলাও হতে পারে শরীরচর্চার অংশ।
আরও পড়ুন: একসঙ্গে খাবার গ্রহণ কমায় ডিপ্রেশনের ঝুঁকি, বলছে গবেষণা
৩. ধূমপানকে না বলুন
দীর্ঘ জীবন চাইলে ধূমপান ছাড়ার বিকল্প নেই। ধূমপানের সঙ্গে বিভিন্ন গুরুতর রোগ ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি জড়িত। ভালো খবর হলো, ধূমপান ছাড়ার সুফল পেতে বয়স কোনো বাধা নয়। শেষ সিগারেটের পর থেকেই শরীর ধীরে ধীরে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু করে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসাই ভালো।
৪. নিজের ভালো লাগাকে গুরুত্ব দিন
শুধু শরীর নয়, মনও ভালো রাখতে হবে। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যে নিজের পছন্দের কাজ, শখ বা বিনোদনের জন্য কিছুটা সময় রাখা যেতে পারে। গবেষণায় সুখী থাকার সঙ্গে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। নিজের জীবনে উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া, ছোট ছোট আনন্দ উপভোগ করা এবং কৃতজ্ঞ থাকার অভ্যাস মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
৫. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কমান
দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা মানসিক চাপ বা উদ্বেগ শরীরের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর সঙ্গে উদ্বেগজনিত সমস্যা, হৃদ্রোগ ও বিষণ্নতার মতো নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রতিদিন কিছুটা সময় নিজের মানসিক চাপ কমানোর জন্য রাখা যেতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম, ডায়েরি লেখা, কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলা, ধ্যান চর্চা এবং বাইরে কিছুটা সময় কাটানো এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
যদি উদ্বেগ বা মানসিক চাপ দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৬. পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখুন
ভালো সামাজিক সম্পর্কও সুস্থভাবে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, বন্ধু কিংবা কাছের মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ মানসিক চাপ মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে এবং সামগ্রিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শুধু অন্যের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়া নয়, প্রয়োজনের সময় পরিবার ও বন্ধুদের পাশে দাঁড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলা, দেখা করা কিংবা সময় কাটানোর অভ্যাস রাখা যেতে পারে।
৭. ঘুমের সময়টা ঠিক করুন
রাত জাগার অভ্যাস শরীরের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা অনেকেই গুরুত্ব দেন না। অথচ শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও নিজেকে পুনরুদ্ধারের জন্য ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। শুধু ঘুমের সময় নয়, প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত কম ঘুমের সঙ্গে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। আবার অতিরিক্ত ঘুমের সঙ্গেও কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাই আজ থেকে খাবারে একটি ফল বা বাড়তি সবজি যোগ করা, কিছুটা বেশি হাঁটা, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, পুরোনো কোনো বন্ধুকে ফোন করা কিংবা প্রতিদিন নিজের পছন্দের কাজের জন্য আধা ঘণ্টা সময় রাখা এমন ছোট পরিবর্তন দিয়েই শুরু করা যায়।
খেয়াল রাখতে হবে দীর্ঘায়ুর কোনো জাদুকরী সূত্র নেই। তবে স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক এই অভ্যাসগুলো একসঙ্গে জীবনের মান উন্নত করতে এবং দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে সহায়তা করতে পারে।