সম্পর্কে সঙ্গীর সব দায়িত্ব আপনার? অজান্তেই ম্যানকিপিং-এর ফাঁদে পড়ছেন না তো?
সকাল আটটা বাজতেই অফিস বেরোনোর তাড়াহুড়ো। সদ্যবিবাহিত আপনি আপনার সঙ্গীকে ডেকে বললেন আমার রুমালটা কোথায়? তিনি রুমালটি এনে দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই আবার ডাক দিয়ে বললেস মানিব্যাগটা নিতে ভুলে গিয়েছি, একটু এনে দাও তো!
প্রথম প্রথম এটি সাধারণ পারিবারিক দৃশ্য মনে হলেও, সম্পর্কের ভেতরের সমীকরণটা অন্য গল্প বলে। প্রতিদিনের এমন ছোটখাটো খুচরো কাজ থেকে শুরু করে সঙ্গীর ব্যক্তিগত জরুরি জিনিসপত্র গুছিয়ে দেওয়া সবকিছুতেই কি আপনাকে লাগে?
যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে খেয়াল করে দেখুন, সম্পর্কের সমতা হারিয়ে আপনি কি ধীরে ধীরে একজন তদারককারীর ভূমিকা পালন করছেন? আধুনিক জীবনযাত্রায় ও সমাজমনস্তাত্ত্বিক আলোচনায় এই পরিস্থিতিকেই বলা হচ্ছে ‘ম্যানকিপিং’। হ্যাঁ তবে, সঙ্গী যদি নিজে থেকেই আপনার সমস্ত কিছুর খেয়াল রাখেন সেটা ভিন্ন কথা।
ম্যানকিপিং ঠিক কী?
সহজ ভাষায়, সম্পর্কের মধ্যে একজন সঙ্গীর ব্যক্তিগত, দৈনন্দিন ও সামাজিক কাজকর্মের একতরফা বোঝা অন্য সঙ্গীর নিজের ঘাড়ে তুলে নেওয়াকে ‘ম্যানকিপিং’ বলা হয়। একসঙ্গে থাকেন, সংসারও দুজন মিলেই করছেন। কিন্তু জামাকাপড় গুছিয়ে রাখা, ইলেকট্রিক বা ওয়াইফাই বিল দেওয়ার কথা মনে করানো, এমনকি সঙ্গীর নিজের বাবা-মায়ের জন্মদিন বা পারিবারিক অনুষ্ঠানের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও যখন নিয়মিত একজনের ওপর এসে পড়ে, তখনই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ম্যানকিপিংকে অনেকে ও Mental Load হিসেবে গুলিয়ে ফেলতে পারেন। আসলে মানসিক চাপ এটি যেকোনো কাজের পরিকল্পনা করা, মনে রাখা ও পরিচালনা করার অদৃশ্য মানসিক চাপকে বোঝায় যা সংসারের যেকোনো ক্ষেত্রে হতে পারে। অন্যদিকে ‘ম্যানকিপিং’ বিশেষভাবে সঙ্গীর ব্যক্তিগত ও দৈনন্দিন দায়িত্ব নিয়মিত নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার একতরফা চর্চাকে নির্দেশ করে।
কেন এটি সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর?
কাউকে ভালোবেসে সাহায্য করা আর নিয়ম করে তার সব কাজ করে দেওয়া দুটির মধ্যে সূক্ষ্ম ফারাক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস চলতে থাকলে সম্পর্কে একাধিক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে-
মানসিক ক্লান্তি ও বিরক্তি
কেবল শারীরিক কাজ নয়, কোন কাজ কখন করতে হবে, কী বাজার শেষ হলো এসব প্রতিনিয়ত মাথায় রাখা প্রচণ্ড মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে।
ক্ষোভ ও মানসিক দূরত্ব
একজন সঙ্গী যখন অনুধাবন করেন যে তিনি কেবল অন্যের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, তখন তার মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে এবং সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যায়।
‘বলে দিলে তো করতাম’ মানসিকতা
সম্পর্কে একজন কেবল মনে করাবেন আর অন্যজন দায় এড়িয়ে বলবেন, 'আমাকে মনে করিয়ে দিলে তো করে দিতাম' এমন আচরণ সম্পর্কে পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধ কমিয়ে দেয়।
লক্ষণগুলো কীভাবে চিনবেন?
আপনার সম্পর্কেও কি অজান্তে ‘ম্যানকিপিং’ ঢুকে পড়েছে? সঙ্গীর দৈনন্দিন ছোটখাটো জিনিসপত্র ও কাজ কি নিয়মিত আপনাকেই মনে করিয়ে দিতে হয়? আপনি উদ্যোগ না নিলে বা মনে না করালে কি তাঁর ব্যক্তিগত বা সামাজিক কাজগুলো আটকে থাকে? নিজের কাজগুলোর দায়িত্ব কি সঙ্গী স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিচ্ছেন, নাকি আপনাকেই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিতে হচ্ছে?
ম্যানকিপিংএর ফাঁদ থেকে বেরোনোর উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কে এই অস্বাস্থ্যকর চর্চা ভাঙতে হলে উভয় পক্ষকেই সচেতন হতে হবে-
সব দায়িত্ব নেওয়া বন্ধ করুন
শুরুতেই সঙ্গীর ব্যক্তিগত সব কাজ নিজের হাতে তুলে নেওয়া বন্ধ করুন। তাকে নিজস্ব কাজ গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিন।
কিছু কাজ করতে দিন
কে বাজার করবেন, কে বিল দেবেন, কে ঘর পরিষ্কার করবেন কথা বলে দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে ভাগ করে নিন।
মনে করানোর অভ্যাস ত্যাগ
প্রতিটি কাজের জন্য বারবার তাগাদা বা রিমাইন্ডার দেওয়া কমান। এতে অন্য সঙ্গীর মধ্যে নিজস্ব দায়িত্ববোধ গড়ে উঠবে।
শান্তভাবে খোলামেলা আলোচনা
কাজের চাপে ক্লান্তি বা বিরক্তি তৈরি হলে রাগ না করে শান্তভাবে সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলুন এবং নিজের মানসিক অবস্থার কথা জানান।
সূত্র: এই সময়