২৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:০১

অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম ভাঙাতে বদলান ৫ অভ্যাস

প্রতীকী ছবি  © এআই সম্পাদিত ছবি।

ঘুম থেকে ওঠার জন্য অ্যালার্ম সেট করা অনেকেরই প্রতিদিনের রুটিনের অংশ। তবে শরীরকে নির্দিষ্ট সময় ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে অভ্যস্ত করে তুলতে পারলে অ্যালার্ম ছাড়াও সময়মতো জেগে ওঠা সম্ভব। এজন্য পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি এবং আলো-অন্ধকারের সঠিক ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজে থেকেই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুললে সকালে ঘুমঘুম ভাব কমতে পারে এবং মেজাজও ভালো থাকতে পারে। তবে এর জন্য শরীরের নিজস্ব ছন্দ বুঝে ধীরে ধীরে রুটিন তৈরি করতে হবে।

পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
শরীর ও মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি। সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখা উচিত। তবে সবার ঘুমের প্রয়োজন এক নয়। কারও সাত ঘণ্টা ঘুমেই শরীর ভালোভাবে কাজ করতে পারে, আবার কারও প্রয়োজন হতে পারে নয় ঘণ্টা।

ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস ডালাসের সেন্টার ফর ব্রেইন হেলথের সহকারী অধ্যাপক এবং স্লিপ ইনোভেশন ল্যাবসের সহযোগী পরিচালক ইটি বেন সাইমনের মতে, ঘুমের প্রয়োজন ব্যক্তিভেদে আলাদা হওয়ার অন্যতম কারণ হলো প্রত্যেকের সার্কাডিয়ান ছন্দ বা ২৪ ঘণ্টার প্রাকৃতিক দেহঘড়ি এক নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যালার্ম ছাড়া ঘুম থেকে ওঠার সময় নির্ধারণ করতে ছুটির দিন বা এমন একটি সপ্তাহ বেছে নেওয়া যেতে পারে, যখন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ওঠার বাধ্যবাধকতা নেই। এতে শরীর স্বাভাবিকভাবে কখন জাগতে চায়, তা বোঝা সহজ হয়।

নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস করুন
শুধু পর্যাপ্ত সময় ঘুমালেই হবে না, প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং জেগে ওঠার অভ্যাস করাও জরুরি।

ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের স্লিপ অ্যান্ড সার্কাডিয়ান রিসার্চ ল্যাবের সহ-পরিচালক হেলেন বার্গেস বলেন, প্রয়োজনীয় ঘুম পূরণ হয় এমন সময় নির্ধারণ করে নিয়মিত ঘুমাতে যেতে হবে। একই রুটিন দীর্ঘদিন অনুসরণ করলে শরীর ধীরে ধীরে সেই সময়ের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়।

অর্থাৎ, প্রতিদিন যদি রাত ১০টা বা ১১টার দিকে ঘুমানোর অভ্যাস থাকে এবং সকালে একই সময়ে ওঠা হয়, একপর্যায়ে শরীর নিজেই সেই সময়কে ঘুম ও জাগরণের সংকেত হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করতে পারে।

সকালের আলো কাজে লাগান
ঘুম ও জাগরণের সময় ঠিক রাখতে আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিক আলো শরীরকে দিনের শুরু সম্পর্কে সংকেত দেয় এবং ঘুম-জাগরণ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলে।

রিজেন্ট ইউনিভার্সিটি লন্ডনের সনদপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানী ও ঘুম গবেষক আনা জয়েস বলেন, সার্কাডিয়ান ঘড়ির সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক হলো আলো। সকালের আলো মেলাটোনিনের কার্যক্রম কমিয়ে শরীরকে জেগে ওঠার সংকেত দেয়।

তাই সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর পর্দা সরিয়ে ঘরে প্রাকৃতিক আলো ঢুকতে দেওয়া উপকারী হতে পারে। এতে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়ে, যা শরীরকে সজাগ ও কর্মপ্রস্তুত হতে সাহায্য করে।

অন্যদিকে রাতে ঘুমানোর সময় ব্ল্যাকআউট পর্দা বা আই মাস্ক ব্যবহার করে অতিরিক্ত আলো এড়িয়ে চলা যেতে পারে।

ঘুমের আগে তৈরি করুন শান্ত পরিবেশ
ঘুমাতে যাওয়ার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে থেকে শরীর ও মনকে ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করা ভালো। এ সময় ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন ধরনের শান্ত রুটিন অনুসরণ করা যেতে পারে। যেমন: ত্বকের যত্ন নেওয়া, দাঁত ব্রাশ করা কিংবা আরামদায়ক পোশাক পরা।

রাতে ঘরের আলোর তীব্রতা কমিয়ে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কম আলো শরীরকে মেলাটোনিন তৈরির সংকেত দেয় এবং ঘুমের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে।

ঘরের তাপমাত্রার দিকেও নজর রাখা দরকার। রাতে শরীরের মূল তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়। অতিরিক্ত গরম পরিবেশে ঘুমাতে বা ঘুম ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্যান বা এসি ব্যবহার করা এবং হালকা পোশাক বা পাতলা চাদর ব্যবহার করা যেতে পারে।

ঘুমের আগে ফোন থেকে দূরে থাকুন
রাতে ভালো ঘুমের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফোনের নীল আলো দিনের আলোর কাছাকাছি হওয়ায় এটি রাতে মস্তিষ্কে বিভ্রান্তিকর সংকেত পাঠাতে পারে।

তবে শুধু নীল আলো নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রল করার অভ্যাসও ঘুমের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একের পর এক আকর্ষণীয় কনটেন্ট দেখার কারণে ঘুমানোর সময় পিছিয়ে যায়।

২০২৫ সালে ৪৫ হাজার নরওয়েজীয় শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এক বিশ্লেষণে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে খারাপ ঘুমের সম্পর্ক পাওয়া যায়।

ঘুমের আগে ফোন ব্যবহার কমাতে অ্যাপ-ব্লকিং ফিচার বা ডিভাইস ব্যবহার করা যেতে পারে। ফোনের অ্যাক্সেসিবিলিটি সেটিংস থেকে গ্রেস্কেল মোড চালু করলেও স্ক্রল করার আকর্ষণ কিছুটা কমতে পারে।

ক্যাফেইন ও রাতের খাবারের সময় ঠিক রাখুন
শরীরের বিপাকক্রিয়াও সার্কাডিয়ান ছন্দকে প্রভাবিত করে। তাই ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত করা এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা সহায়ক হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা ভালো। একই সঙ্গে যতটা সম্ভব অ্যালকোহল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আরও দেখুন: কর্মচারী নিয়োগ দেবে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় 

হেলেন বার্গেস বলেন, অ্যালকোহল হয়তো দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। এটি ঘুমের এমন একটি পর্যায়কে দমন করে, যা শেখার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, স্মৃতি সংরক্ষণ ও পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ধীরে ধীরে বদলান ঘুমের সময়
জীবনের নানা ব্যস্ততা, মানসিক চাপ কিংবা প্রতিদিনের পরিবর্তিত সময়সূচির কারণে নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তাই হঠাৎ করে ঘুমানোর সময় অনেকটা পরিবর্তন না করে ধীরে ধীরে রুটিন বদলানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

হেলেন বার্গেস বলেন, ঘুম ও জাগরণের সময় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একবারে আধা ঘণ্টা করে এগোনো ভালো। প্রতিদিন আধা ঘণ্টা করে ঘুমানোর ও জেগে ওঠার সময় এগিয়ে এনে কাঙ্ক্ষিত সময়ে পৌঁছানোর পর সেই সময়সূচি ধরে রাখতে হবে।

অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তৈরি করতে তাই একসঙ্গে সবকিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। পর্যাপ্ত ঘুম, নির্দিষ্ট রুটিন, সকালে পর্যাপ্ত আলো এবং রাতে শান্ত পরিবেশ এই বিষয়গুলো নিয়মিত মেনে চলাই ধীরে ধীরে শরীরের নিজস্ব ঘড়িকে নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ঘুমের অভ্যাস পরিবর্তন দ্রুত হয় না। নিজের শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বুঝে ধৈর্যের সঙ্গে ধীরে ধীরে রুটিন তৈরি করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।