২১ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৪১

ডায়াবেটিস থাকলে কখন কলা খাবেন? বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

ডায়াবেটিস হলে কখন কলা খাওয়া যায়   © সংগৃহীত

ডায়াবেটিস থাকলে কলা খাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে অনেকেরই দ্বিধা রয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি হওয়ায় অনেকে মনে করেন, এই ফল রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়াবেটিস থাকলেও কলা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কখন খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং কলাটি কতটা পাকা—এই তিন বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

কলা আমাদের প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকা পরিচিত একটি ফল। রাস্তার ফলের দোকান থেকে শুরু করে বাড়ির রান্নাঘর—সব জায়গাতেই এর উপস্থিতি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিক্রি হয়, টিফিনে রাখা হয় কিংবা শরীরচর্চার পর দ্রুত শক্তি পাওয়ার জন্যও অনেকে কলা খান। প্রাকৃতিক মিষ্টতা, সহজে বহন করা যায় এবং তুলনামূলক কম দাম—সব মিলিয়ে কলা বেশ জনপ্রিয়। তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এই ফলের মিষ্টতা নিয়ে অনেকেরই সংশয় রয়েছে।

ডায়াবেটিস থাকলে কি একেবারেই কলা খাওয়া যাবে না? নাকি রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ না বাড়িয়ে নিরাপদে কলা খাওয়ার কোনো উপায় আছে? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস থাকলেও কলা পুরোপুরি এড়িয়ে চলার প্রয়োজন নেই। তবে কখন কলা খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং কোন ধরনের কলা বেছে নিচ্ছেন—এসবের ওপর এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে।

কলা খাওয়ার উপকারিতা ও ডায়াবেটিসে এটি কতটা নিরাপদ, তা জানার আগে ফলটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য উপকারিতা জেনে নেওয়া যাক।

১. ধীরে ধীরে শক্তি জোগায়

কলায় জটিল কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা ধীরে হজম হয়। বিশেষ করে কম পাকা কলায় এ ধরনের কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেশি থাকে। ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এভাবে ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ হলে ক্ষুধা ও অপ্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ধীরে ধীরে শক্তি পাওয়া উপকারী হতে পারে, কারণ এতে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।

২. আঁশের ভালো উৎস

মাঝারি আকারের একটি কলায় প্রায় ৩ গ্রাম খাদ্যআঁশ থাকে। আঁশ রক্তে শর্করা শোষণের গতি ধীর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি পরিমাণে খাদ্যআঁশ গ্রহণ রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং ইনসুলিন প্রতিরোধের ঝুঁকি কমাতে পারে।

৩. পটাশিয়াম ও ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ

প্রতি ১০০ গ্রাম কলায় প্রায় ৩৫৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে। এটি পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং শরীরে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কলা উপকারী হতে পারে। ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ করতেও এটি সহায়তা করতে পারে।

৪. ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ

কলায় ভিটামিন সি, ভিটামিন বি৬ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। ২০২০ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতি ১০০ গ্রাম কলায় প্রায় ২২ দশমিক ৮৪ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে এবং এটি প্রায় ৩৭০ কিলোজুল শক্তি সরবরাহ করে। একই সঙ্গে এতে থাকা পটাশিয়াম দৈনিক প্রয়োজনীয় পটাশিয়ামের প্রায় ৮ শতাংশ পূরণ করতে পারে। এসব পুষ্টি উপাদান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে।

৫. মেজাজ ভালো রাখতে সহায়তা করে

কলায় থাকা ভিটামিন বি৬ শরীরে সেরোটোনিন তৈরিতে সহায়তা করে। সেরোটোনিন মানসিক সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রাসায়নিক উপাদান, যা বিরক্তি ও ক্লান্তি কমাতে সহায়তা করতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখাও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ দিক থেকেও কলা উপকারী হতে পারে।

এই উপকারিতাগুলোর কারণে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও খাবারের তালিকা থেকে কলা পুরোপুরি বাদ না দিয়ে পরিমিত পরিমাণে খেতে পারেন।

ডায়াবেটিসে কলা কি নিরাপদ?

হ্যাঁ, ডায়াবেটিস থাকলেও কলা খাওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে পরিমাণ ও সময় গুরুত্বপূর্ণ। কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাঝারি মাত্রার। অর্থাৎ উচ্চ জিআইযুক্ত খাবারের তুলনায় কলা রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক ধীরে বাড়ায়। তবে কতটা কলা খাচ্ছেন, সেটি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

জাসলক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রধান ডায়েটিশিয়ান ও নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিকস বিভাগের প্রধান দেলনাজ টি. চন্দুওয়াদিয়া বলেন, ‘আপনার রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসার ধরন বিবেচনায় রেখে কখন এবং কতটা কলা খাবেন, সে বিষয়ে একজন যোগ্য পুষ্টিবিদ আপনাকে পরামর্শ দিতে পারেন।’

অর্থাৎ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কলা নিষিদ্ধ কোনো খাবার নয়। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে ও সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে কলা খাওয়া যেতে পারে।

ডায়াবেটিসে কলা খাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় কখন?

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকেরই প্রশ্ন—কলা খাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় কখন? বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাত বা রুটির মতো বেশি কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে কলা না খেয়ে দুই বেলার খাবারের মাঝখানে হালকা নাশতা হিসেবে খাওয়া ভালো।

পি.ডি. হিন্দুজা হাসপাতাল অ্যান্ড মেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের ডায়েটেটিকস বিভাগের সিনিয়র কর্মকর্তা ও প্রধান সুইডাল ত্রিনিদাদে পরামর্শ দিয়েছেন, ‘দুপুরের খাবার বা রাতের খাবারের সঙ্গে কলা খাওয়া উচিত নয়। কারণ এগুলো প্রধান খাবার বা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার। এর পরিবর্তে দুই বেলার খাবারের মাঝখানে কলা খাওয়া নিরাপদ। এতে সারা দিন শরীরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ক্যালরি খরচ হয়ে যায়।’

সকালের নাশতার পর এবং দুপুরের খাবারের আগে কিংবা বিকেলে দুই বেলার খাবারের মাঝখানে কলা খেলে দিনের বিভিন্ন কাজের সময় সেই শক্তি ব্যবহার করা যায়। এতে বেশি কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে কলা খাওয়ার কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কমতে পারে।

ডায়াবেটিসে পাকা না কাঁচা কলা?

কলা কতটা পেকেছে, তার ওপরও এর চিনির পরিমাণ নির্ভর করে। সামান্য কাঁচা বা কম পাকা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ বেশি এবং চিনি তুলনামূলক কম থাকে। তাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এ ধরনের কলা তুলনামূলক উপযোগী হতে পারে।

কাঁচা বা অল্প পাকা কলায় চিনি কম এবং রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ বেশি থাকে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক ধীরে বাড়ে।

পাকা হলুদ কলায় চিনির পরিমাণ মাঝারি এবং রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চও মাঝারি মাত্রায় থাকে। ফলে রক্তে শর্করার ওপর এর প্রভাবও মাঝারি।

অতিরিক্ত পাকা বা বাদামি কলায় চিনির পরিমাণ বেশি এবং রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ খুব কম থাকে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়তে পারে।

তাই তুলনামূলক কম পাকা কলা বেছে নেওয়া ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কলার পুষ্টিগুণ পাওয়ার পাশাপাশি রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর একটি সহজ উপায় হতে পারে।

ডায়াবেটিসবান্ধব উপায়ে কলা খাবেন যেভাবে

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে বিভিন্নভাবে কলা খেতে পারেন।

১. কলার চা

কলা খোসাসহ বা খোসা ছাড়িয়ে কয়েক মিনিট পানিতে ফুটিয়ে কলার চা তৈরি করা যায়। এরপর পানি ছেঁকে নিয়ে পান করতে হয়। এতে কলার কিছু পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়, তবে পুরো কলার মতো চিনি গ্রহণ করতে হয় না। এটি গরম অবস্থায় এবং কোনো ধরনের মিষ্টি উপাদান না মিশিয়ে পান করা ভালো।

২. কাঁচা বা অল্প পাকা কলা

কাঁচা ও সামান্য কাঁচা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ থাকে, যা অন্ত্রে অনেকটা খাদ্যআঁশের মতো কাজ করে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। কাঁচা কলা ভারতীয় বিভিন্ন প্রচলিত খাবার, যেমন তরকারি ও ভাজিতে ব্যবহার করা হয়। ফলে ডায়াবেটিসবান্ধব খাবারের অংশ হিসেবেও এটি রাখা যেতে পারে।

রক্তে শর্করা না বাড়িয়ে কলা খাওয়ার পরামর্শ

ডায়াবেটিসে কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

১. নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন: রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কলা না খাওয়াই ভালো।

২. বেশি কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের সঙ্গে কলা খাবেন না: ভাত, রুটি বা পাউরুটির সঙ্গে কলা খাওয়া এড়িয়ে চলুন।

৩. সঠিক সময় বেছে নিন: সকালের মাঝামাঝি বা বিকেলের মাঝামাঝি সময়ে কলা খেতে পারেন, যখন শরীর সক্রিয় থাকে।

৪. শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন: কলা খাওয়ার পর হালকা শারীরিক কর্মকাণ্ড করলে শরীর কার্বোহাইড্রেট ব্যবহার করতে পারে।

৫. পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন: রক্তে শর্করার ওপর প্রভাব কমাতে ছোট একটি কলা বা অর্ধেক কলা খাওয়াই ভালো।

কলা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত একটি ফল এবং এর রয়েছে পুষ্টিগত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব। ডায়াবেটিস থাকলে কলা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং সচেতনভাবে খাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে, পরিমিত পরিমাণে এবং প্রয়োজন হলে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে কলা খেলে এটি ডায়াবেটিসের খাবারের তালিকাতেও নিরাপদ ও পুষ্টিকর একটি অংশ হতে পারে।