২০ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৩৫

খাবার-পানি থেকেও রক্তে মেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক, বাঁচার উপায় কী?

মাইক্রোপ্লাস্টিক  © টিডিসি সম্পাদিত

পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাকে বলা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক। প্রতিদিনের খাবার, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে অজান্তেই এসব ক্ষুদ্র কণা মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃৎ, মস্তিষ্ক ও প্লাসেন্টাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি দিন দিন গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসের কারণে প্রধানত খাদ্য ও পানীয়, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং কিছু প্রসাধনী ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

যেভাবে শরীরে ঢোকে মাইক্রোপ্লাস্টিক

খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে
বোতলজাত পানি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, মাছ, প্রক্রিয়াজাত লবণসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। টি-ব্যাগ থেকেও প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা পানীয়তে মিশতে পারে। এ ছাড়া প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার বা পানীয় রাখলে তাপের প্রভাবে প্লাস্টিক থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক ও ক্ষুদ্র কণা খাবারে মিশে যেতে পারে।

শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে
সিন্থেটিক তন্তুর পোশাক, কার্পেট, আসবাবের ধুলা এবং যানবাহনের টায়ারের ক্ষয় থেকে বাতাসে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা ছড়াতে পারে। শ্বাস নেওয়ার সময় এসব কণা ফুসফুসে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, নাইলন বা পলিপ্রোপিলিন শিল্পে কাজ করা ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় প্লাস্টিকজাত তন্তুর সংস্পর্শে থাকার কারণে ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

প্রসাধনী ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের মাধ্যমে
কিছু প্রসাধনীতে ব্যবহৃত মাইক্রোবিডস এবং সিন্থেটিক উপাদান থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার সুযোগ রয়েছে। তবে ত্বকের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ ও এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

কোন কোন অঙ্গে পাওয়া গেছে
গবেষণায় রক্তনালির প্লাক, ফুসফুস, যকৃৎ, মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ এবং প্লাসেন্টায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব কণা শরীরে প্রদাহ ও অন্যান্য জৈবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে বলে গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

পরিপাকতন্ত্রে প্রভাব
খাবারের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিপাকতন্ত্রে পৌঁছাতে পারে। এগুলো অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক জীবাণুসমষ্টির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে। এর ফলে হজম ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শ্বাসতন্ত্রে প্রভাব
শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে পৌঁছানো প্লাস্টিকের কণা শ্বাসনালিতে জ্বালাপোড়া ও প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এর সঙ্গে কাশি, হাঁচি, শ্বাসকষ্ট বা শ্বাসনালির অন্যান্য সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে। দীর্ঘদিন প্লাস্টিকজাত তন্তুর সংস্পর্শে থাকা শিল্পশ্রমিকদের ক্ষেত্রে ফুসফুসের বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি নিয়েও গবেষণায় উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।

হরমোন ও প্রজননস্বাস্থ্যে সম্ভাব্য প্রভাব
প্লাস্টিক উৎপাদনে ব্যবহৃত বিসফেনল-এ (বিপিএ) ও থ্যালেটসের মতো কিছু রাসায়নিককে এন্ডোক্রাইন-ব্যাহতকারী উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। মাইক্রোপ্লাস্টিক ও এসব রাসায়নিকের সম্ভাব্য প্রভাব পুরুষের শুক্রাণুর গুণগত মান ও সংখ্যা এবং নারীর প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর কীভাবে পড়ে, তা নিয়েও গবেষণা চলছে।

হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ঝুঁকি
রক্তনালিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। একটি গবেষণায় রক্তনালির প্লাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া রোগীদের মধ্যে হৃদ্‌যন্ত্র ও মস্তিষ্কের রক্তনালিজনিত গুরুতর ঘটনার ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে। তবে এ ধরনের সম্পর্ককে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

আরও দেখুন: প্রতিদিনের খাবারে কেন রাখবেন হলুদ?

কীভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমাবেন
পরিবেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কঠিন। তবে কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এর সংস্পর্শ কমানো সম্ভব।

প্লাস্টিকের বদলে কাচ বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করুন: পানি ও খাবার সংরক্ষণে কাচ, স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার রাখবেন না: বিশেষ করে গরম খাবার বা পানীয় প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা এবং প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।

মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিক ব্যবহার এড়িয়ে চলুন: প্লাস্টিকের পাত্র বা প্লাস্টিক র‍্যাপ ব্যবহার করে খাবার গরম না করাই নিরাপদ।

সিন্থেটিক কাপড়ের ব্যবহার কমান: সম্ভব হলে সুতি, লিনেন বা পাটের মতো প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক ব্যবহার করা যেতে পারে।

ঘর নিয়মিত পরিষ্কার করুন: ঘরের ধুলা ও বাতাসে ভাসমান কণা কমাতে নিয়মিত ভেজা কাপড়ে পরিষ্কার করা বা ভ্যাকুয়াম ব্যবহার করা যেতে পারে। সিন্থেটিক কার্পেটের ব্যবহারও কমানো ভালো।

তাজা খাবারকে প্রাধান্য দিন: অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও প্লাস্টিক মোড়কজাত খাবারের পরিবর্তে তাজা ফল, শাকসবজি ও ঘরে প্রস্তুত খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। টি-ব্যাগের পরিবর্তে সরাসরি চা-পাতা ব্যবহার করাও একটি বিকল্প।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও দৈনন্দিন জীবনে কিছু সচেতনতা ঝুঁকি কমাতে পারে। একই সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। তাই এ বিষয়ে আতঙ্কিত না হয়ে প্লাস্টিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো এবং নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা ইত্যাদি বিষয়ে চিকিৎকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।