০৮ আগস্ট ২০২৬, ২২:৩২

বর্ষা-শরতে ‘চোখ ওঠা’র উৎপাত: বাঁচবেন কীভাবে, হলে প্রতিকার কী

চোখ ওঠার প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে চোখ লাল হয়ে যাওয়া  © এআই নির্মিত

চোখের সাদা অংশ এবং পাতার ভেতরের পাতলা পর্দার এক ধরনের ইনফেকশন বা প্রদাহকে এ দেশে ‘চোখ ওঠা’ বলা হয়। ডাক্তারি ভাষায় এর নাম কনজাংকটিভাইটিস। মূলত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া অথবা অ্যালার্জির কারণে এই সংক্রমণ হয়ে থাকে। এই রোগ হলে চোখ লাল হয়ে যায়, চোখ দিয়ে পানি পড়ে, খচখচ করে এবং সকালে চোখের পাতা পিঁচুটি দিয়ে জোড়া লেগে থাকে। এটি একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির চোখ থেকে নিঃসৃত পানি বা ব্যবহৃত জিনিসের মাধ্যমে দ্রুত অন্য মানুষের চোখে ছড়ায়।

কখন হয়, কেন হয়
দেখা যায়— কোনো একজনের চোখ উঠলে বাসার অন্য সবাই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ ছাড়া প্রথমত বাতাস, ধূলোবালি, দূষিত পানির মাধ্যমে ব্যক্তির চোখে এর সংক্রমণ হতে পারে। এ কারণে অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই রোগ থেকে বাঁচতে কিছু নির্দেশনা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন।

যে মৌসুমে বাতাসে আদ্রতা বেশি থাকে, সে সময় এ রোগটা বেশি হয়। এ কারণে রোগটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বর্ষা মৌসুমে এবং অনেক সময় বর্ষা-পরবর্তী শরৎকালের প্রারম্ভে। বিশেষ করে বর্ষাকালে বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কারণে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি এবং বিস্তার দ্রুত ঘটে, যা চোখ ওঠার প্রধান কারণ।

‘চোখ ওঠা’ থেকে সুরক্ষিত থাকতে কী করবেন
মাত্র তিনটি কাজের মাধ্যমে ‘চোখ ওঠা’ ছড়ানো ঠেকানো যায়। এগুলো হলো—

এক. যার চোখ উঠেছে তার রুমাল, গামছা, তোয়ালে, বালিশ—এগুলো ব্যবহার করা যাবে না। যিনি আক্রান্ত হয়েছেন, তিনি এগুলো আলাদা রাখবেন। একই সঙ্গে গরম পানিতে ডিটারজেন্ট অথবা সাবান দিয়ে বালিশের কাভার, বিছানার চাদর, গামছা, তোয়ালে কিংবা মুখে ব্যবহার করা হয় এমন জিনিসপত্র ধুয়ে নিবেন। আর ধোয়া শেষ করে ভালো করে নিজের হাত ধুয়ে নিবেন।

দুই. এই ইনফেকশন বাতাসেও ছড়ায়, হাঁচি-কাশির মাধ্যমে। তাই বিশেষ করে যার চোখে উঠেছে, তাকে হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় মুখ আর নাক ঢেকে নিতে হবে। টিস্যু দিয়ে ঢাকলে ব্যবহারের পর টিস্যুটা ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ফেলে দেবেন।

তিন, চোখ ওঠা রোগীর হাত ধোয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চোখে ড্রপ অথবা মলম লাগানোর আগে-পরে এবং চোখ পরিষ্কার করার আগে-পরে। তার আশেপাশে অন্যরা গেলেও নিয়মিত হাত ধোতে হবে। আর খেয়াল রাখতে হবে চোখে যেন হাত না যায়। কোন কারণে যদি চোখে হাত দিতেও হয়, তাহলে তার আগে অবশ্যই ভালো করে হাত ধুয়ে নিতে হবে। না হলে সহজেই এই ইনফেকশন রোগী থেকে তার আশেপাশের মানুষে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

অনেকেই মনে করেন, চোখ ওঠা কারো দিকে তাকালে চোখ ওঠে। এটি সম্পূর্ণ ভুল। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। চোখ ওঠা রোগীর দিকে তাকালে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু তার আশেপাশে গেলে উল্লিখিত সতর্কতা মানতে হবে। নিয়মিত হাত ধোয়া, রোগীর ব্যবহৃত জিনিসপত্র ব্যবহার না করা, চোখে হাত না দেয়া— এসবের মাধ্যমে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায়।

চোখ ওঠার আছে ঘরোয়া চিকিৎসাও
চোখ উঠলে কিছু ঘরোয়া পদ্ধতিতে মুক্তি মিলতে পারে। যেমন—

এক. ঠান্ডা পানির শেক। এক টুকরা পরিষ্কার কাপড় পানিতে ভিজিয়ে পানি ঝেড়ে নিয়ে সেটা দিয়ে চোখে শেক দেওয়া যায়। কয়েক মিনিট ধরে ভেজা কাপড় দিয়ে আলতো করে চাপ দিলে চোখে আরাম পাওয়া যায়।

দুই. চোখ মোছা। হাত দিয়ে চোখ কচলাবেন না বা চুলকাবেন না। এতে চোখের সমস্যা আরো বেড়ে যেতে পারে, চোখের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাহলে চোখ মুছবেন কি করে? পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে নিন। তারপর সেই কুসুম গরম পানিতে পরিষ্কার কাপড় বা তুলা ভিজিয়ে আলতোভাবে চোখের পাপড়িগুলো মুছে ফেলুন। এতে চোখে জমা পুঁজ আর ময়লা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

অবশ্যই মনে রাখতে হবে, দুই চোখের জন্য আলাদা আলাদা কাপড় বা তুলা ব্যবহার করতে হবে। শেষ করার পর কাপড়টা ধুয়ে নিবেন, পারলে হালকা গরম পানি আর সাবান দিয়ে। আর যদি তুলা ব্যবহার করে থাকেন সেটা ময়লার ঝুড়িতে ফেলে আর সব শেষ করে নিজের হাতটা ভালো করে ধুয়ে নিবেন।

তিন, চোখের ড্রপ। এক ধরনের চোখের ড্রপ ব্যবহার করলে চোখে অস্বস্তি, খচখচে অথবা আঠালো ভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে। এগুলোকে বলে লুব্রিকেটিং আই ড্রপস বা আর্টিফিশিয়াল টিয়ারস। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ফার্মেসিতে এই ড্রপস পাওয়া যায়। তবে অবশ্যই নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।

চার. অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ। চোখ ওঠা সাধারণত নিজে নিজেই সেরে যায়। ওষুধের প্রয়োজন পড়ে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ প্রয়োজন হতে পারে। যেমন ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, অথবা ইনফেকশন যদি খুব গুরুতর হয়, অনেক অস্বস্তি লাগতে থাকে বা কোন কারণে রোগ যদি দ্রুত সারানোর প্রয়োজন পড়ে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করতে হবে। তিনি প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ দেবেন।

নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে কিনে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ দেবেন না। কারণ ভাইরাস এবং এলার্জির কারণেও চোখ লাল হতে পারে, পানি পড়তে পারে। তখন অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ কোনো কাজ করবে না। ব্যাকটেরিয়াল কনজাংকটিভাইটিস হলে সাধারণত চোখ থেকে পুঁজের মত পিঁচুটি বের হয় এবং ঘুম থেকে ওঠার পর চোখ লেগে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায়। আর ভাইরাস ইনফেকশন হলে সাধারণত পুঁজ বের হয় না। এতে শুধু চোখ লাল হয়, পানি পড়ে, জ্বালাপোড়া করে। ভাইরাস ইনফেকশনে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ দিয়ে কোনো লাভ হয় না। এ ছাড়া ইনফেকশন ছাড়াও অ্যালার্জির কারণেও কনজাংকটিভাইটিস হতে পারে।

চোখে ড্রপ দেয়ার পর সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি একটু ঘোলা হতে পারে। তাই ড্রপ দেয়ার পরপরই গাড়ি চালানো বা ভারী কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। যারা চোখে মেকাপ বা প্রসাধনী এবং কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করেন, তাদের চোখ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এগুলো ব্যবহার করা যাবে না। চোখ সেরে যাওয়ার পরে নতুন প্রসাধনী এবং নতুন কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করতে পারবেন।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
চোখ ওঠা সাধারণত প্রাণঘাতী রোগ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। এজন্য চিকিৎসকের কাছে সাধারণত যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ গুরুতর কিছু হয়ে থাকতে পারে অথবা চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। সেটি কখন? যদি দুই সপ্তাহ পরও রোগ না সারে অথবা যদি চোখে ব্যথা হয়, চোখ খুব লাল হয়ে যায়, চোখ মোছার পরেও আলোতে সমস্যা হয় বা চোখে দেখতে সমস্যা হয়—যেমন কাঁপা কাঁপা দৃষ্টি, ঝাপসা দৃষ্টি অথবা ঝলসানো আলো দেখা।

এ ছাড়া শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। কারণ শিশুরা যেহেতু মনের ভাব যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারে না, সেহেতু তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উত্তম।