অফিসে ৮ ঘণ্টা বসে কাজ করলেই কি ভুঁড়ি বাড়ে, জানুন বিশেষজ্ঞদের মতামত
অফিসে টানা আট ঘণ্টা বসে কাজ করলেই কি ভুঁড়ি বেড়ে যায়? এমন প্রশ্ন অনেকেরই। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দীর্ঘ সময় বসে থাকাই ভুঁড়ির একমাত্র কারণ নয়। তবে নিয়মিত দীর্ঘ সময় বসে থাকা, শরীরচর্চার অভাব, অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার, মানসিক চাপ ও অনিয়মিত জীবনযাপন একসঙ্গে মিলে পেটের মেদ ও স্থূলতার ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। তাই ডেস্কে বসে কাজ করা ব্যক্তিদের অন্যদের তুলনায় ওজন বাড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় বসে থাকা শরীরের শক্তি খরচ কমিয়ে দেয়। ফলে খাবার থেকে পাওয়া অতিরিক্ত ক্যালোরি সহজেই শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হতে শুরু করে। বিশেষ করে পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর চারপাশে জমা হওয়া ভিসেরাল ফ্যাট ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
রাজধানীর পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নওসাবাহ্ নূর বলেন, একটানা দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা শরীরের জন্য মোটেও ভালো নয়। শুধু ভুঁড়ি নয়, এর কারণে কোমর ও ঘাড়ের ব্যথা, কাঁধ শক্ত হয়ে যাওয়া, পায়ে ফোলাভাব, চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া এবং মানসিক ক্লান্তির মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
তিনি জানান, অধিকাংশ অফিসেই এমন চেয়ার-টেবিল ব্যবহার করা হয়, যেখানে দীর্ঘ সময় সঠিক ভঙ্গিতে বসে কাজ করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেকের দীর্ঘদিনের কোমরব্যথা ও ঘাড়ব্যথার পেছনে ভুল দেহভঙ্গিও বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একই ভঙ্গিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাজ করলে কারও কারও ফ্রোজেন শোল্ডারও হতে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের শুষ্কতা, মাথাব্যথা ও চোখে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। যেসব অফিসে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নেই, সেখানে অ্যালার্জির সমস্যাও বাড়তে পারে। অনেকের আবার দীর্ঘ সময় বসে থাকার কারণে পা ভারী হয়ে যায় বা পায়ে পানি জমার মতো সমস্যাও দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় বসে থাকার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে শরীরের বিপাকক্রিয়ার ওপর। শরীর কম নড়াচড়া করলে ক্যালোরি পোড়ানোর হারও কমে যায়। যদি এর সঙ্গে অতিরিক্ত খাবার খাওয়া বা উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত ফাস্টফুডের অভ্যাস থাকে, তাহলে ওজন দ্রুত বাড়তে শুরু করে।
২০২৩ সালে কেয়ারপ্লাসের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার তথ্যেও অফিসকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ওই তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো কর্মীদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় ভুগছিলেন। একই হারে রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি পাওয়া যায়। এ ছাড়া ২৮ শতাংশের ফ্যাটি লিভার, ১৮ শতাংশের লিভারের এনজাইম বৃদ্ধি এবং ১০ শতাংশের রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকের ওজন স্বাভাবিক মনে হলেও শরীরের ভেতরে, বিশেষ করে পেটের গভীরে চর্বি জমতে পারে। এই ভিসেরাল ফ্যাট বাইরে থেকে সব সময় বোঝা যায় না, কিন্তু এটি স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।
চিকিৎসকদের মতে, শুধু বসে থাকাই নয়, আরও কয়েকটি অভ্যাস ওজন বাড়ানোর জন্য দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত ফাস্টফুড খাওয়া, কোমল পানীয় পান, ব্যস্ততার কারণে বাসার খাবার এড়িয়ে চলা, মানসিক চাপের কারণে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাওয়া এবং নিয়মিত ব্যায়াম না করা।
অনেকেই অফিস শেষে শরীরচর্চার বদলে বিশ্রামকে প্রাধান্য দেন। ফলে দিনের বেশির ভাগ সময়ই তারা বসে কাটান। এতে শরীরের শক্তি ব্যয় কমে যায় এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি ধীরে ধীরে চর্বিতে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থূলতা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়। এটি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, রক্তে চর্বির মাত্রা বৃদ্ধি, ফ্যাটি লিভার, স্ট্রোক এবং কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
তবে সুসংবাদ হলো, কয়েকটি সহজ অভ্যাস বদলেই এই ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, প্রতি ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পরপর চেয়ার থেকে উঠে অন্তত ২ থেকে ৫ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা উচিত। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার, অফিসে ছোটখাটো কাজের জন্য হেঁটে যাওয়া, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা এবং সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক।
পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় বেশি করে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, মাছ ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। ফাস্টফুড, অতিরিক্ত চিনি ও কোমল পানীয় কম খাওয়াও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। এতে ওজন, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও লিভারের অবস্থা সম্পর্কে আগেই ধারণা পাওয়া যায় এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত হলো, শুধু আট ঘণ্টা বসে কাজ করলেই ভুঁড়ি হয় না। তবে দীর্ঘ সময় বসে থাকা যদি অনিয়মিত খাবার, শরীরচর্চার অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে পেটের মেদ ও স্থূলতার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই কাজের ফাঁকে নিয়মিত নড়াচড়া, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং প্রতিদিন কিছুটা সময় ব্যায়ামের জন্য রাখা—এই তিনটি অভ্যাসই ভুঁড়ি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর।