০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫০

লিভারের তিন ‘নীরব ঘাতক’, যেসব লক্ষণ অবহেলা করলেই বিপদ

মানবদেহের সবচেয়ে কর্মব্যস্ত অঙ্গগুলোর একটি লিভার  © সংগৃহীত

মানবদেহের সবচেয়ে কর্মব্যস্ত অঙ্গগুলোর একটি লিভার। খাবার হজম থেকে শুরু করে শক্তি সঞ্চয়, রক্ত থেকে ক্ষতিকর বর্জ্য অপসারণ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলাসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ নীরবে করে যায় এই অঙ্গটি। লিভারের বিশেষত্ব হলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নিজ থেকেই অনেকটাই পুনর্গঠন করতে পারে।

দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, অতিরিক্ত মদ্যপান, স্থূলতা কিংবা ভাইরাল সংক্রমণের কারণে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে এক সময় সে সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তখন দেখা দিতে পারে সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর এমনকি লিভার ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী জটিলতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে লিভার রোগের সবচেয়ে বড় তিনটি কারণ হলো অতিরিক্ত মদ্যপান, স্থূলতাজনিত ফ্যাটি লিভার এবং ভাইরাল হেপাটাইটিস। এগুলোকে লিভারের ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগটির আগে থেকে তেমন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় লিভারের বিভিন্ন রোগে। এর মধ্যে শুধু ভাইরাল হেপাটাইটিসেই প্রাণ হারান ১০ লাখের বেশি মানুষ। অন্যদিকে, স্থূলতা ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে ফ্যাটি লিভারের প্রকোপও দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন কোনো না কোনো মাত্রায় ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত।

অতিরিক্ত মদ্যপান কেন এত বিপজ্জনক?
অনেকেই মনে করেন, কেবল অতিরিক্ত মাত্রায় মদ্যপান করলেই লিভারের ক্ষতি হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন নিয়মিত অ্যালকোহল গ্রহণ করলেও ধীরে ধীরে লিভারে ক্ষতি শুরু হয়। প্রথমে লিভারে চর্বি জমে অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার তৈরি হয়। পরে তা অ্যালকোহলিক হেপাটাইটিসে রূপ নিতে পারে। 

সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে স্থায়ী দাগ বা ফাইব্রোসিস তৈরি হয় এবং সিরোসিসে পরিণত হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ার শুরুতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না।

স্থূলতা ও ফ্যাটি লিভার বড় ভয়ের কারণ
বর্তমানে শুধু মদ্যপান নয়, স্থূলতাও লিভারের অন্যতম বড় শত্রু। অতিরিক্ত ওজনের কারণে লিভারে চর্বি জমে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ হতে পারে। এমনকি যাঁরা কখনও মদ্যপান করেন না, তাঁরাও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, মেটাবলিক সিনড্রোম কিংবা শারীরিকভাবে কম সক্রিয় ব্যক্তিদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

সবচেয়ে আশার কথা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরলের মতো রোগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফ্যাটি লিভার অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

ভাইরাল হেপাটাইটিসও নীরব ঘাতক
লিভারের জন্য আরেকটি বড় হুমকি হলো ভাইরাল হেপাটাইটিস, বিশেষ করে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’। এই দুই ভাইরাস বছরের পর বছর শরীরে কোনো লক্ষণ ছাড়াই অবস্থান করতে পারে। ফলে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে, তাঁদের লিভার ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাসময়ে শনাক্ত ও চিকিৎসা না করলে দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ থেকে সিরোসিস, লিভার ফেলিওর এবং লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে হেপাটাইটিস ‘বি’ টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি বর্তমানে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ উভয়েরই কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে।

আরও পড়ুন: ঢাবিতে আওয়ামী লীগপন্থী ১০ শিক্ষকের শাস্তি প্রত্যাহার চায় শিক্ষক সমিতি

চিকিৎসকদের মতে, কেউ যদি একই সঙ্গে স্থূলতায় ভোগেন, নিয়মিত মদ্যপান করেন এবং ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হন, তাহলে লিভারের ক্ষতির ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এ অবস্থায় লিভারে প্রদাহ দ্রুত বাড়ে, টিস্যু নষ্ট হয় এবং সিরোসিস বা লিভার ফেলিওরের দিকে রোগ দ্রুত অগ্রসর হতে পারে।

যেসব লক্ষণ অবহেলা করবেন না
লিভারের রোগের শুরুতে সাধারণত তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, খাওয়ার প্রতি অনীহা, পেটের ডান পাশের ওপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি, বমিভাব বা বমি, চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস), পা বা পেট ফুলে যাওয়া, গাঢ় রঙের প্রস্রাব এমন কিছু অনুভব করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, মদ্যপান সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। প্রয়োজন হলে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ পরীক্ষা করানো, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করা। (সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস)