২২ জুলাই ২০২৬, ১৬:৩৯

ব্রেন ফগ কী, কেন হয়? কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন

ব্রেন ফগের প্রতীকি ছবি  © এআই সম্পাদিত ছবি

ব্যস্ত জীবন, কর্মক্ষেত্রের চাপ, স্মার্টফোনের অবিরাম নোটিফিকেশন ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে অনেকেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যখন কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিচিত মানুষের নাম মনে করতে সমস্যা হয়, সহজ সিদ্ধান্ত নিতেও সময় লাগে কিংবা মাথা যেন কুয়াশায় ঢেকে আছে বলে মনে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের অবস্থাকে বলা হয় ব্রেন ফগ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রেন ফগ কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়; বরং এটি এমন একটি উপসর্গ, যা মস্তিষ্কের মনোযোগ, স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।

ব্রেন ফগের লক্ষণ
ব্রেন ফগ হলে সাধারণত কয়েকটি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে: দীর্ঘ সময় কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, ছোটখাটো বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হওয়া, সাম্প্রতিক ঘটনা, পরিচিত মানুষের নাম বা প্রয়োজনীয় জিনিস কোথায় রাখা হয়েছে তা বারবার ভুলে যাওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি অনুভব করা, চিন্তায় জড়তা তৈরি হওয়া, তথ্য বুঝতে বা দ্রুত কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে দেরি হওয়া।

কেন হয় ব্রেন ফগ
চিকিৎসকদের মতে, বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক কারণ ব্রেন ফগের জন্য দায়ী হতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। ফলে মনোযোগ ও যৌক্তিক চিন্তাশক্তি কমে যেতে পারে।

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব: ঘুমের সময় মস্তিষ্ক নিজেকে পুনর্গঠনের কাজ করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কে বর্জ্য পদার্থ অপসারণ ব্যাহত হয়, যা ব্রেন ফগের ঝুঁকি বাড়ায়।

পুষ্টির ঘাটতি: ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন ডি, আয়রন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

ডিজিটাল ওভারলোড: দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন, কম্পিউটার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটালে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ওপর চাপ পড়ে, যা মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে।

হরমোনজনিত সমস্যা: থাইরয়েডের অসুস্থতা, রক্তস্বল্পতা বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণেও ব্রেন ফগ দেখা দিতে পারে।

অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয় এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও পড়ুন : নুডলসের প্যাকেট হাতে নেওয়ার আগে খেয়াল রাখুন এসব বিষয়

ব্রেন ফগ কমাতে যা করবেন
বিশেষজ্ঞরা জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছেন, প্রতিদিন কিছু সময় মোবাইল, কম্পিউটারসহ সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে থাকুন। বিশেষ করে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার এড়িয়ে চলুন, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার, শাকসবজি ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করুন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন, সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হাঁটা বা নিয়মিত ব্যায়াম করুন। এতে মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং মনোযোগ উন্নত হয়, প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট ধ্যান বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা করলে মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে, একসঙ্গে অনেক কাজ করার বদলে একটি কাজ শেষ করে পরবর্তী কাজে মনোযোগ দিন।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার পরও যদি দীর্ঘদিন ব্রেন ফগের উপসর্গ থেকে যায় বা আরও বাড়তে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ, থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা বা স্নায়বিক জটিলতার মতো অন্য কোনো রোগের লক্ষণও হতে পারে। বিশেষ করে স্মৃতিশক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ব্রেন ফগ মূলত মস্তিষ্কের একটি সতর্কবার্তা। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।