সকালের রুটিনে বদল আনলেই কমবে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকেরই অকারণে মন খারাপ থাকে, দুশ্চিন্তা ভর করে বা সারাদিনের জন্য এক ধরনের চাপ অনুভূত হয়। এর পেছনে বড় ভূমিকা থাকতে পারে কর্টিসল হরমোনের। শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় এই হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে তৈরি হতে পারে অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও মেজাজের পরিবর্তন। তাই সকালে শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা নয়, কর্টিসল নিয়ন্ত্রণেও নজর দেওয়া জরুরি।
কর্টিসল হলো শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেরয়েড হরমোন, যা মূলত কিডনির ওপর থাকা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়। একে সাধারণভাবে ‘স্ট্রেস হরমোন’ বলা হয়, কারণ মানসিক চাপ, ভয়, উদ্বেগ বা শারীরিক চাপের সময় শরীরে এর মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
তবে কর্টিসল শুধু স্ট্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, শরীরের অনেক জরুরি কাজেও এটি ভূমিকা রাখে। যেমন: রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, শরীরে শক্তি, ব্যবহারের প্রক্রিয়া (মেটাবলিজম) নিয়ন্ত্রণ করে, রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে ভূমিকা রাখে, প্রদাহ ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে, ঘুম ও জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
সাধারণত সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কর্টিসলের মাত্রা বেশি থাকে, কারণ এটি শরীরকে দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। পরে দিনের সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা কমতে থাকে। তবে দীর্ঘদিন ধরে কর্টিসলের মাত্রা বেশি থাকলে ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, মেজাজের পরিবর্তন, ওজন বৃদ্ধি, রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়া এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কর্টিসলের ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকদের মতে, দিনের মধ্যে সাধারণত সকাল ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে কর্টিসলের মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। আর রাতের দিকে এর মাত্রা কমে যায়। জীবনযাপনের কিছু ভুল অভ্যাস এই হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযাযী, কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়া, নিয়মিত প্রাতরাশ না করা, সকালে খালি পেটে কফি বা ধূমপানের অভ্যাস কর্টিসলের মাত্রা বাড়াতে পারে। অনেকেই ওজন কমানোর চিন্তায় বাড়ির স্বাভাবিক খাবার, শর্করা বা মৌসুমি ফল এড়িয়ে চলেন। কিন্তু শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির ঘাটতি হলে মস্তিষ্কে এক ধরনের বিপদের সংকেত পৌঁছায়, যা কর্টিসল বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতে খাবারে পরিমাণমতো কার্বোহাইড্রেট থাকা প্রয়োজন। এটি সেরোটোনিন হরমোন তৈরিতে সহায়তা করে, যা ভালো ঘুম ও মানসিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে।
মৌসুমি ফলও শরীরের জন্য উপকারী। ফলে থাকা ফ্রুক্টোজ শরীরে গিয়ে শক্তি জোগায়। তাই অতিরিক্ত স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে ফল বা শর্করা পুরোপুরি বাদ দেওয়া ঠিক নয় বলে মনে করছেন পুষ্টিবিদরা। কর্টিসলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েকটি অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ—
পর্যাপ্ত ঘুম: নিয়মিত ও গভীর ঘুম কর্টিসলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। রাত জেগে থাকা ও দীর্ঘ সময় মোবাইলের স্ক্রিন দেখা এই হরমোন বাড়াতে পারে।
আরও পড়ুন : কেন জমে গিয়েছিল উত্তর মেরুর আগে দক্ষিণ মেরু, মিলেছে রহস্যের ব্যাখ্যা
শারীরিক ব্যায়াম: সকালে হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। এতে কর্টিসলের অতিরিক্ত বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে থাকে।
শ্বাসের ব্যায়াম ও ধ্যান: নিয়মিত প্রাণায়াম, ধ্যান বা গভীর শ্বাসের অনুশীলন মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
ইতিবাচক মনোভাব: সকালে ঘুম থেকে উঠে নেতিবাচক খবর বা উদ্বেগ তৈরি করে এমন বিষয় এড়িয়ে ভালো লাগার কিছু করা মন ভালো রাখতে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের শুরুটা স্বাস্থ্যকরভাবে করতে পারলে কর্টিসলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয় এবং সারাদিনের মানসিক অবস্থাও ভালো থাকে।