০৩ জুলাই ২০২৬, ২১:৪৭

বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, মোকাবেলা করবেন যেভাবে

আর্দ্রতার কারণে হতে পারে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি  © এআই নির্মিত

বর্ষাকালের সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত প্রায় ১৫ দিন ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি রয়েছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে এটি ৭০ থেকে ৯৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। ভোর ও গভীর রাতে, কিংবা বৃষ্টির সময় অনেক এলাকায় আর্দ্রতা ৯০ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। আবার দুপুরে কিছুটা কমলেও বেশিরভাগ সময়ই তা ৭০ শতাংশের নিচে নামেনি।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বর্ষাকালে উচ্চ আর্দ্রতা অস্বাভাবিক নয়। তবে এবার উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে অতিরিক্ত আর্দ্রতা যুক্ত হওয়ায় প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে শরীরে অনুভূত তাপমাত্রা (হিট ইনডেক্স) কয়েক ডিগ্রি বেশি লাগছে। ফলে গরমের তীব্রতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় আর্দ্র পরিবেশে থাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাসাবাড়ির বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যও।

গত ১৫ দিনের আর্দ্রতার চিত্র
সাম্প্রতিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে— ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে আর্দ্রতা বেশিরভাগ দিনই ৯০-৯৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। দুপুর ১টা থেকে ৩টার মধ্যে এটি কিছুটা কমে ৭০-৮০ শতাংশে নেমেছে। আর বিকেলের বৃষ্টি কিংবা সন্ধ্যার পর আবার দ্রুত ৮৫-৯৫ শতাংশে উঠে গেছে। এ ছাড়া উপকূলীয় এলাকায় প্রায় পুরো সময়ই আর্দ্রতা ৮০ শতাংশের ওপরে ছিল। ঢাকায়ও গত দুই সপ্তাহে অধিকাংশ দিন আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭৫-৯০ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বসবাসের জন্য আদর্শ আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। এর ওপরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে মানুষ, ভবন এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি— সবকিছুর ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে।

কেন বেশি কষ্ট হচ্ছে?
অনেকেই প্রশ্ন করছেন, তাপমাত্রা ৩২ বা ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও এত গরম লাগছে কেন? এর কারণ বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতা। শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজের তাপ বাইরে বের করে দেয়। কিন্তু বাতাসে জলীয়বাষ্প বেশি থাকলে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ফলে শরীরের ভেতরের তাপ আটকে যায় এবং মানুষ প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি গরম অনুভব করে।

যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
১. হিট স্ট্রেস ও হিট এক্সহসশন
অতিরিক্ত আর্দ্রতায় দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয়। দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব, দ্রুত হৃদস্পন্দন এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

করণীয়
* প্রতি ২০-৩০ মিনিট পরপর পানি পান করুন, তৃষ্ণা না পেলেও।
* ওরস্যালাইন বা লবণ-চিনির পানি পান করা যেতে পারে।
* দুপুর ১১টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন।
* হালকা রঙের সুতি পোশাক পরুন।

২. শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জি
উচ্চ আর্দ্রতায় বাতাসে ছত্রাকের স্পোর, ধুলিকণা ও অ্যালার্জেন বেশি সময় ভেসে থাকে। এতে হাঁপানি, অ্যালার্জিক রাইনাইটিস ও সিওপিডি বা ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (দীর্ঘমেয়াদী ফুসফুসের রোগ বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা) রোগীদের সমস্যা বাড়তে পারে।

করণীয়
* ঘর নিয়মিত শুকনো রাখুন।
* এসির ফিল্টার ও এক্সহস্ট ফ্যান পরিষ্কার রাখুন।
* যাদের হাঁপানি আছে, ইনহেলার সঙ্গে রাখুন।

৩. ত্বকের সমস্যা
ঘাম দীর্ঘ সময় ত্বকে জমে থাকায় ঘামাচি, ফাঙ্গাল সংক্রমণ, দাদ, অ্যাথলেটস ফুট এবং ত্বকে চুলকানির প্রবণতা বাড়ে।

করণীয়
* ভেজা কাপড় দ্রুত বদলান।
* গোসলের পর শরীর ভালোভাবে মুছে শুকিয়ে নিন।
* পায়ের আঙুলের ফাঁক শুকনো রাখুন।

৪. ঘুমের ব্যাঘাত
উচ্চ আর্দ্রতায় রাতে ঘুমের মান কমে যায়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না হওয়ায় পরদিন কর্মক্ষমতাও কমে।

করণীয়
* শোয়ার আগে ঘরের বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
* এসির Dry Mode থাকলে ব্যবহার করুন।
* বিছানার চাদর নিয়মিত রোদে দিন।

ডেঙ্গু ও মশার ঝুঁকি কেন বাড়ে?
উচ্চ আর্দ্রতা এবং থেমে থাকা বৃষ্টির পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। ফুলের টব, এসির ড্রেন ট্রে, ফ্রিজের নিচের পানি, ছাদ, বারান্দা, পুরোনো টায়ার কিংবা পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা অল্প পানিতেও ডিম দিতে পারে এডিস।

যা করবেন
* সপ্তাহে অন্তত এক দিন সব ধরনের পানি জমার স্থান পরিষ্কার করুন।
* ফুলের টবের পানি নিয়মিত বদলান।
* এসির ড্রেন ট্রে পরিষ্কার রাখুন।
* জানালা-দরজায় মশারি বা নেট ব্যবহার করুন।
* ভোর ও সন্ধ্যায় পূর্ণ হাতা পোশাক পরুন।

আর্দ্রতায় নষ্ট হতে পারে ইলেকট্রনিক্স
উচ্চ আর্দ্রতা শুধু মানুষের জন্য নয়, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিরও বড় শত্রু। বাতাসের অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প ধীরে ধীরে যন্ত্রের ভেতরে ঢুকে সার্কিট বোর্ডে করোশন তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন আর্দ্র পরিবেশে থাকলে ক্যামেরার লেন্সে ফাঙ্গাস, কম্পিউটারের মাদারবোর্ডে অক্সিডেশন, টেলিভিশনের সার্কিটে আর্দ্রতা এবং স্পিকারে শব্দ বিকৃত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে
* রেফ্রিজারেটর
* এয়ার কন্ডিশনার
* টেলিভিশন
* ডেস্কটপ ও ল্যাপটপ
* ক্যামেরা ও লেন্স
* ওয়াই-ফাই রাউটার
* প্রিন্টার
* মিউজিক সিস্টেম

রেফ্রিজারেটরে কী সমস্যা হয়?
* দরজার রাবার গ্যাসকেটে কালো ফাঙ্গাস জন্মাতে পারে।
* অতিরিক্ত আর্দ্রতায় ভেতরে পানি জমে দুর্গন্ধ হতে পারে।
* কম্প্রেসরের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে বিদ্যুৎ খরচ বাড়তে পারে।
* দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বৃদ্ধি ঘটে।

যেভাবে যত্ন নেবেন
* সপ্তাহে অন্তত একবার দরজার রাবার গ্যাসকেট পরিষ্কার করুন।
* ফ্রিজে গরম খাবার রাখবেন না।
* দরজা অপ্রয়োজনে দীর্ঘ সময় খোলা রাখবেন না।
* ডিফ্রস্ট ও ড্রেন হোল নিয়মিত পরীক্ষা করুন।

এসি, কম্পিউটার ও ক্যামেরার যত্ন
* এসির ফিল্টার ১৫-৩০ দিন পরপর পরিষ্কার করুন।
* সম্ভব হলে মাঝে মাঝে Dry Mode ব্যবহার করুন।
* ক্যামেরা ও লেন্স এয়ারটাইট বক্সে সিলিকা জেলসহ সংরক্ষণ করুন।
* দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ইলেকট্রনিক্স সপ্তাহে অন্তত একবার চালু করুন।
* ঘরের আর্দ্রতা কমাতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন।

ঘরকে আর্দ্রতামুক্ত রাখার সহজ উপায়
* জানালা খুলে বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন, তবে বৃষ্টির সময় বন্ধ রাখুন।
* কাপড় ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় ভেজা অবস্থায় শুকাতে দেবেন না।
* বাথরুম ব্যবহারের পর এক্সহস্ট ফ্যান চালান।
* আলমারি, ড্রয়ার ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে সিলিকা জেল ব্যবহার করুন।
* সম্ভব হলে ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ আর্দ্রতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও সচেতনতা ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এর ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমানো যায়। পর্যাপ্ত পানি পান, ঘর শুকনো রাখা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ— এই চারটি বিষয় মেনে চললে বর্ষাকালের উচ্চ আর্দ্রতার বড় অংশের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।