০২ জুলাই ২০২৬, ১৬:০১

টাইপ-৫ ডায়াবেটিস কী? যেসব লক্ষণে বুঝবেন

রক্তে শর্করার মাত্রা মাপার যন্ত্র (গ্লুকোমিটার)  © টিডিসি সম্পাদিত ছবি

দীর্ঘদিনের অপুষ্টির কারণে সৃষ্টি হওয়া এক ধরনের ডায়াবেটিসকে টাইপ-৫ ডায়াবেটিস হিসেবে চিহ্নিত করছেন একদল গবেষক। তাদের দাবি, এ রোগকে টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস ভেবে ভুল চিকিৎসা দেওয়ার কারণে অনেক রোগী মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছেন। গবেষকদের ধারণা, বিশ্বজুড়ে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ টাইপ-৫ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন।

যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এখনো এটিকে আলাদা ধরনের ডায়াবেটিস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে ২৫১টি জাতীয় ডায়াবেটিস সংগঠনকে প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডএফ) ২০২৫ সালে এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।

কীভাবে আলাদা টাইপ-৫?
ডায়াবেটিসে শরীর রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে শরীর ইনসুলিন উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, আর টাইপ-২ ডায়াবেটিস ইনসুলিন প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অন্যদিকে গবেষকদের মতে, টাইপ-৫ ডায়াবেটিস দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির কারণে অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ রোগীদের শরীরে কিছু ইনসুলিন তৈরি হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম হয়। একই সঙ্গে তারা ইনসুলিনের প্রতি অস্বাভাবিকভাবে সংবেদনশীল থাকেন। ফলে প্রচলিত চিকিৎসা সব সময় কার্যকর হয় না, বরং কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকরও হতে পারে।

যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের লক্ষণ অনেকটাই অন্যান্য ধরনের ডায়াবেটিসের মতো। এর মধ্যে রয়েছে সব সময় ক্লান্ত লাগা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা পাওয়া, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, বিশেষ করে রাতে, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, মুখ শুকিয়ে থাকা, ঝাপসা দৃষ্টি, দুর্বলতা ও শরীর কাঁপা।

গবেষকদের মতে, রোগটি সাধারণত গুরুতরভাবে কম ওজনের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ভুল করে একে টাইপ-১ ডায়াবেটিস হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

রোগ ধরা না পড়লে কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুল চিকিৎসা রোগীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মাত্রার ইনসুলিনও হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দিতে পারে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।

এ ছাড়া রোগটি দীর্ঘদিন অশনাক্ত থাকলে অন্যান্য ডায়াবেটিসের মতোই অন্ধত্ব, কিডনি বিকলতা, স্নায়ুর ক্ষতি, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া এবং গুরুতর অবস্থায় অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজন হতে পারে।

অপুষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক
গবেষকদের মতে, টাইপ-৫ ডায়াবেটিস এশিয়া ও সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে বেশি দেখা যায়, যেখানে শৈশবের অপুষ্টির হার এখনও বেশি। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় অন্যান্য দেশেও কম ওজনের মানুষের মধ্যে এ ধরনের ডায়াবেটিসের প্রবণতা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৬ লাখের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্থূল নন এমন মানুষের মধ্যেও তথাকথিত লিন ডায়াবেটিস বা অপুষ্টি-সংশ্লিষ্ট ডায়াবেটিসের হার বাড়ছে।

কেন বিতর্ক?
টাইপ-৫ ডায়াবেটিসকে ঘিরে এখনও বিতর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা মনে করে, এটিকে আলাদা রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষা বা বায়োমার্কার না থাকায় রোগটি শনাক্ত করা কঠিন। বর্তমানে চিকিৎসকেরা রোগীর শৈশবের অপুষ্টির ইতিহাস, কম ওজন এবং ইনসুলিনের প্রতি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য টাইপ-৫ ডায়াবেটিস শনাক্ত করেন।

টাইপ-৫ ডায়াবেটিস নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ১৯৯৯ ও ২০০৬ সালে ডায়াবেটিসের শ্রেণিবিন্যাস সংশোধনের সময় এটিকে পৃথক একটি ধরন হিসেবে রাখার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সংস্থাটি স্বীকার করেছে, বর্তমান শ্রেণিবিন্যাস সব ধরনের ডায়াবেটিস রোগীর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে না এবং ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত প্রমাণ মিললে টাইপ-৫ পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

আরও পড়ুন : ঢাবির প্রতি ব্যারিস্টার ফুয়াদদের এতো আক্রোশের কারণ কী?

তবে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন ইতোমধ্যে এ রোগের নির্ণয় পদ্ধতি ও চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরির জন্য একটি বিশেষজ্ঞ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে।

ড. মেরেডিথ হকিন্স বলেন, ‘টাইপ-৫ ডায়াবেটিস শনাক্ত করতে না পারা খুবই বিস্তৃত একটি সমস্যা। এর ফলে অনেক রোগী অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইনসুলিন নিচ্ছেন, যা তাদের মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করছে। আমরা এমন অনেক তরুণকে দেখেছি, যারা সকালে আর জেগে ওঠেনি।’

অন্যদিকে, ভারতের ড. ভি মোহান এ বিষয়ে বলেন, ‘এটি যদি সত্যিই টাইপ-৫ হয়, তাহলে কীভাবে এটি নির্ণয় করবেন? এর জন্য একটি নির্দিষ্ট মার্কার দেখান।’

তবে টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের স্বীকৃতি রোগীদের উপকারে আসছে বলে মনে করেন ড. মেরেডিথ হকিন্স। তার ভাষায়, ‘প্রথমবারের মতো খুব শিগগিরই বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত এন্ডোক্রিনোলজির পাঠ্যবইয়ে টাইপ-৫ ডায়াবেটিস নিয়ে একটি পৃথক অধ্যায় যুক্ত হতে যাচ্ছে।’

ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘আমরা সম্ভবত একটি গুরুতর বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। এটি আগামী প্রজন্মের জন্য খুব খারাপ সংবাদ বয়ে আনবে।’ তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।