শিশুকে খাওয়াতে হাতে স্মার্টফোন দিচ্ছেন? ছোট শিশুর জন্য বিপদের ইঙ্গিত গবেষণায়
শিশুকে শান্ত রাখতে বা খাওয়ানোর জন্য অনেক অভিভাবকই হাতে তুলে দেন স্মার্টফোন। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, দুই বছরের কম বয়সি শিশু যদি প্রতিদিন দীর্ঘ সময় মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে, তাহলে তার ভাষা শেখা, বুদ্ধিবিকাশ ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
বর্তমানে অনেক শিশুর মধ্যেই খাবারের প্রতি এক ধরনের অনীহা দেখা যায়। খাওয়ানোর সময় তারা সহজে খাবার খেতে চায় না, ফলে অভিভাবক—বিশেষ করে মায়েদের নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। সন্তানকে খাওয়ানোর জন্য তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উপায়গুলোর একটি হলো স্মার্টফোনে কার্টুন বা ভিডিও চালিয়ে দেওয়া।
অন্যদিকে, যেসব পরিবারের বাবা-মা দুজনই কর্মজীবী, তাদের অনেক সন্তান দিনের বড় একটি সময় গৃহপরিচারিকা বা অন্য কারও তত্ত্বাবধানে থাকে। এসব শিশুর ক্ষেত্রেও সময় কাটানোর সহজ মাধ্যম হিসেবে স্মার্টফোন ব্যবহার করা হয়। ফলে অল্প বয়স থেকেই অনেক শিশু দীর্ঘ সময় মোবাইলের পর্দার সামনে কাটানোর অভ্যাস গড়ে তোলে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২ বছরের কম বয়সী শিশু দিনে ১ থেকে ৪ ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় মোবাইল ব্যবহার করলে তার জ্ঞানীয় বিকাশে বিলম্ব হতে পারে। বিশেষ করে যারা দিনে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে থাকে, তাদের কথা বলা শেখা ও সামগ্রিক মানসিক বিকাশে উল্লেখযোগ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গবেষকদের তথ্যমতে, ১ থেকে ২ বছর বয়সী এক হাজারের বেশি শিশুর ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব শিশু দিনের বেশির ভাগ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, তাদের অনেকেরই মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বয়স বাড়লেও তারা ঠিকমতো কথা বলতে শেখেনি। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু শিশুর ক্ষেত্রে অটিজমও শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের দাবি, স্মার্টফোন থেকে নির্গত রেডিয়েশন শিশুদের জন্য তুলনামূলক বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ, ছোট শিশুদের মস্তিষ্কের টিস্যু, কোষ ও খুলির হাড় প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি নরম ও পাতলা। ফলে তারা প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি রেডিয়েশন শোষণ করে। এতে মস্তিষ্ক, কানসহ বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ভাষা শেখায় বিলম্ব, মনোযোগের সমস্যা, জ্ঞানীয় বিকাশে প্রভাবের পাশাপাশি নন-ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের ঝুঁকিও থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, মোবাইলের স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলো এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য শিশুর মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের একটি রাসায়নিক নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা ধীরে ধীরে এক ধরনের আসক্তির সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে শিশু বাস্তব পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে এবং মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
গবেষকদের মতে, শুধু মনোযোগ কমে যাওয়াই নয়, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে অনেক শিশু ঠিকমতো কথা বলতে পারে না এবং আবেগ প্রকাশেও পিছিয়ে পড়ে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন, অনেক শিশুই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পর্যাপ্ত কথোপকথনের সুযোগ পায় না। তাদের সময় কাটে মোবাইল বা ট্যাবের পর্দার সামনে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৯ সালের নির্দেশিকায় বলেছে, ১ বছরের কম বয়সি শিশুদের কোনো ধরনের স্ক্রিনের সামনে রাখা উচিত নয়। আর ২ থেকে ৪ বছর বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম সুপারিশ করা হয়েছে, এর চেয়ে কম হলে আরও ভালো।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস (এএপি) সুপারিশ করেছে, ১৮ মাসের কম বয়সি শিশুদের জন্য ভিডিও কল ছাড়া অন্য কোনো ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার না করাই ভালো। ১৮ থেকে ২৪ মাস বয়সে স্ক্রিন ব্যবহার করলেও তা সীমিত সময়ের জন্য এবং অভিভাবকের উপস্থিতিতে মানসম্মত কনটেন্ট হওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: ঢাবিতে কীভাবে অনার্স ভর্তি বন্ধ করা যায়, ভাবতে হবে
এদিকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১ বছর বয়সে বেশি স্ক্রিন টাইম থাকা শিশুদের ২ ও ৪ বছর বয়সে যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান এবং ব্যক্তিগত-সামাজিক দক্ষতার বিকাশে বিলম্বের ঝুঁকি বেশি ছিল।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনায়ও উল্লেখ করা হয়েছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের ভাষা বিকাশ, মনোযোগ এবং নির্বাহী কার্যক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে গবেষকেরা এটিও বলেছেন, সব শিশুর ক্ষেত্রে প্রভাব এক রকম নয় এবং কনটেন্টের ধরন, স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ও পারিবারিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে অনেক অভিভাবক শিশুকে খাওয়ানো বা শান্ত রাখার জন্য মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহার করেন। এতে শিশু সহজে খাবার খায় এবং কিছু সময় শান্ত থাকে। তবে গবেষকদের সতর্কবার্তা, এই সাময়িক স্বস্তির আড়ালে দীর্ঘমেয়াদে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।