০৯ মে ২০২৬, ০৮:৫০

হার্টবিটের ছোট পরিবর্তনেই মিলতে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকির আভাস

প্রতীকী ছবি  © টিডিসি ফটো/এআই

মানুষ সাধারণত হৃদস্পন্দন বলতে প্রতি মিনিটে হৃদয়ের কতবার স্পন্দন হচ্ছে সেটিকেই বোঝে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু হার্ট রেট নয়, দুইটি হৃদস্পন্দনের মাঝের সময়ের ক্ষুদ্র ওঠানামাও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে। এই পরিবর্তনকে বলা হয় হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি (এইচআরভি)। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, এইচআরভি মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ঘুম, ব্যায়ামের সক্ষমতা এমনকি বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়া সম্পর্কেও সংকেত দিতে পারে। 

এইচআরভি কী?
স্বাভাবিক অবস্থায় হৃদযন্ত্র নিয়মিতভাবে স্পন্দিত হলেও প্রতিটি স্পন্দনের মাঝে সময়ের সামান্য পার্থক্য থাকে। এই ক্ষুদ্র পরিবর্তন মিলিসেকেন্ডে মাপা হয়। চিকিৎসকদের মতে, সাধারণভাবে বেশি এইচআরভি ভালো লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। কারণ এটি নির্দেশ করে যে শরীরের স্নায়ুতন্ত্র পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত মানিয়ে নিতে পারছে।

দৌড়ানো বা মানসিক চাপের সময় শরীরের ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ ব্যবস্থা সক্রিয় হলে হৃদস্পন্দন দ্রুত ও স্থিতিশীল হয়, ফলে এইচআরভি কমে যায়। বিপরীতে বিশ্রামের সময় শরীর ‘রেস্ট-অ্যান্ড-ডাইজেস্ট’ অবস্থায় ফিরলে হৃদস্পন্দনের বৈচিত্র্য বাড়ে। জার্মানির কিল ইউনিভার্সিটির গবেষক ডেনিস লারসনের মতে, উচ্চ এইচআরভি বোঝায় শরীর দ্রুত চাপ সামলে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সক্ষম।

গবেষণায় উদ্বেগ, বিষণ্নতা, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি), ডিমেনশিয়া ও স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত অনেক মানুষের এইচআরভি তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরকে দীর্ঘ সময় ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ অবস্থায় রাখায় স্নায়ুতন্ত্র স্বাভাবিকভাবে শিথিল হতে পারে না। ২০২৩ সালের এক গবেষণা পর্যালোচনায়ও উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের এইচআরভি কম থাকার প্রবণতা দেখা গেছে, যদিও গবেষকরা এ বিষয়ে আরও বড় ও নির্ভরযোগ্য গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এইচআরভি শরীরের বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়া সম্পর্কেও ধারণা দিতে পারে। যেহেতু এইচআরভি শরীর কতটা ভালোভাবে চাপ সামলাচ্ছে তা বোঝায়, তাই এটি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকিরও ইঙ্গিত দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম কি সাহায্য করে?
কিছু কিছু গবেষক মনে করেন, সচেতনভাবে এইচআরভি উন্নত করা সম্ভব। বিশেষ করে ধীর ও নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এতে সহায়ক হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী টিম হারজগ প্রতিদিন দুইবার প্রায় ২০ মিনিট ধীরে শ্বাস নেওয়ার অনুশীলনের পরামর্শ দেন। যেমন চার সেকেন্ড ধরে শ্বাস নেওয়া এবং ছয় সেকেন্ড ধরে শ্বাস ছাড়ার অনুশীলন।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের অনুশীলন পিটিএসডি ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া ঘুমের উন্নতি, রক্তচাপ কমানো ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা কমানোর সঙ্গেও এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

কীভাবে এইচআরভি ট্র্যাক করবেন?
বর্তমানে অনেক স্মার্টওয়াচ ও ফিটনেস ডিভাইসে এইচআরভি মাপার সুবিধা রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, বুকের সঙ্গে লাগানো সেন্সরযুক্ত ডিভাইস সাধারণত কব্জিতে পরা ডিভাইসের চেয়ে বেশি নির্ভুল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইচআরভি একদিনের সংখ্যা নয়; বরং দীর্ঘ সময়ের প্রবণতা দেখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। খারাপ ঘুম, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, মাদকজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ বা অতিরিক্ত ব্যায়ামের পর এইচআরভি কমে যেতে পারে। অন্যদিকে নিয়মিত শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ধীরে ধীরে এটি উন্নত করতে পারে। তবে চিকিৎসক দীপক ভাটের মতে, এইচআরভি আকর্ষণীয় একটি সূচক হলেও সাধারণ মানুষের জন্য হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, ওজন, কোমরের মাপ ও কোলেস্টেরলের মতো মৌলিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানা আরও বেশি জরুরি। [সূত্র:বিবিসি]