‘নিষ্ক্রিয়’ স্ক্রিন টাইমে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি, মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
দীর্ঘ সময় বসে থাকা শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যই নয়, মস্তিষ্কের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তবে বিষয়টি নির্ভর করে সেই সময়টিতে আপনি কী করছেন তার ওপর। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিকভাবে নিষ্ক্রিয় (প্যাসিভ) স্ক্রিন টাইম, যেমন টেলিভিশন দেখা বা উদ্দেশ্যহীন মোবাইল ফোন স্ক্রলিং, ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, একই সময় বসে থেকেও যদি কেউ বই পড়ে, ধাঁধা সমাধান করে বা নতুন কিছু শেখে তাহলে তা মস্তিষ্কের জন্য সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষণায় যা জানা গেছে: আমেরিকান জার্নাল অব প্রিভেনটিভ মেডিসিন-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় সুইডেনের ২০ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ককে প্রায় দুই দশক ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ৩৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। তাদের দৈনন্দিন বসে থাকার সময় এবং সেই সময় কী ধরনের কাজ করছেন এই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয় পরবর্তী সময়ে কারা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদে ৫৬৯ জনের মধ্যে এই রোগ শনাক্ত হয়।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বসে থাকার সময়কে দুই ভাগে ভাগ করা:
১. মানসিকভাবে নিষ্ক্রিয়
২. মানসিকভাবে সক্রিয়
ফলাফলে দেখা যায়, যারা বেশি সময় নিষ্ক্রিয়ভাবে কাটিয়েছেন, তাদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিপরীতে, মানসিকভাবে সক্রিয় কাজের সঙ্গে যুক্তদের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। এমনকি গবেষকরা হিসাব করে দেখেছেন যদি কেউ প্রতিদিনের এক ঘণ্টা নিষ্ক্রিয় সময়কে সক্রিয় মানসিক কাজে ব্যয় করেন, তাহলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
গবেষণা অনুযায়ী নিষ্ক্রিয় কাজের মধ্যে রয়েছে টিভি দেখা, উদ্দেশ্যহীনভাবে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা, মনোযোগ ছাড়াই গান শোনা ইত্যাদি। এছাড়া সক্রিয় কাজের মধ্যে রয়েছে বই পড়া, ক্রসওয়ার্ড বা ধাঁধা সমাধান, সেলাই, বুনন বা সৃজনশীল কাজ এ কম্পিউটারে চিন্তাশীল কাজ করা ইত্যাদি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল পার্থক্যটা হলো মস্তিষ্ক কতটা কাজ করছে। একই সময় বসে থাকলেও কাজের ধরন অনুযায়ী প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
কেন ঝুঁকি বাড়ে?
মস্তিষ্ককে সচল রাখতে নিয়মিত ‘চ্যালেঞ্জ’ প্রয়োজন। মানসিকভাবে সক্রিয় কাজ নিউরনের সংযোগ শক্তিশালী করে এবং মস্তিষ্কের অভিযোজন ক্ষমতা বাড়ায়, যা 'কগনিটিভ রিজার্ভ' নামে পরিচিত।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকলে মস্তিষ্কে উদ্দীপনা কমে যায়, রক্ত সঞ্চালন হ্রাস পেতে পারে, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। এছাড়া নিষ্ক্রিয় অভ্যাসের সঙ্গে খারাপ ঘুমের সম্পর্কও থাকতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্ক্রিন টাইম কি পুরোপুরি ক্ষতিকর?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব স্ক্রিন টাইম ক্ষতিকর নয়। বিষয়টি নির্ভর করে ব্যবহারের ওপর। টিভি দেখে সময় কাটানো নিষ্ক্রিয়, অনলাইনে নতুন কিছু শেখা বা সমস্যা সমাধান সক্রিয় অর্থাৎ, স্ক্রিন নয় বরং 'কম মানসিক সম্পৃক্ততা' এখানে মূল সমস্যা।
কী করলে মস্তিষ্ক ভালো থাকবে?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়মিত বই পড়া, নতুন দক্ষতা শেখা (ভাষা, রান্না, বাদ্যযন্ত্র), ধাঁধা বা গেম খেলা সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা, বিশেষ করে অন্যদের সঙ্গে মিলে এসব কাজ করলে মস্তিষ্কের জন্য আরও বেশি উপকার পাওয়া যায়।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, শুধু মানসিক নয়, শারীরিক কার্যক্রমও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্যায়াম ও মানসিকভাবে সক্রিয় জীবনধারা একসঙ্গে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি কমাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। তাই দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকার বদলে, সেই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা জরুরি। [সূত্র: সিএনএন]