কোন সময় ঘুমালে রোগের ঝুঁকি বাড়ে?
স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু সুষম খাদ্য বা ব্যায়ামই নয়, নিয়মিত ও সঠিক সময়ে ঘুমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ব্যস্ত জীবনযাত্রায় অনেকেই দেরিতে ঘুমানো, দিনে ঘুমানো বা অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন যা ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে নীরব ক্ষতি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমের সময়ের এই অনিয়ম শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দকে (সার্কাডিয়ান রিদম) ভেঙে দেয়, যার প্রভাব পড়ে হরমোন, মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রসহ পুরো শরীরে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ঘুমের ক্ষেত্রে শুধু 'কতক্ষণ' নয়, 'কখন' ঘুমানো হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঘুমানো এবং ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে জেগে ওঠা শরীরের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি বা ঠিকভাবে কাজ না করলে হরমোন নিঃসরণ, ঘুমের গভীরতা ও শরীরের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
রাত জাগার অভ্যাস বাড়াচ্ছে ঝুঁকি: বিশেষজ্ঞরা জানান, নিয়মিত রাত ১২টার পর ঘুমাতে গেলে শরীরে মেলাটনিন হরমোনের নিঃসরণ কমে যায়। এতে ঘুমের গভীরতা কমে এবং শরীরের কোষ মেরামতের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও মানসিক অবসাদের ঝুঁকি বাড়ে।
ভোররাতে ঘুমানো আরও ক্ষতিকর: রাত ২টা থেকে ৪টার মধ্যে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের সম্পূর্ণ বিপরীত। এতে সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা, সারাদিন ক্লান্তি এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে দীর্ঘমেয়াদে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
দিনের ঘুম ও অনিয়মে বাড়ছে সমস্যা: সকাল ৯টার পর দীর্ঘ সময় ঘুমানো কিংবা বিকেল-সন্ধ্যায় অতিরিক্ত ঘুম শরীরের ঘুম-জাগরণের চক্রকে এলোমেলো করে দেয়। এর ফলে রাতে ঘুমের সমস্যা বা ইনসমনিয়া দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও সমস্যা হয়।
অনিয়মিত ঘুমে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট: প্রতিদিন ভিন্ন সময়ে ঘুমানো যেমন একদিন রাত ১০টা, আরেকদিন রাত ২টা এই ধরনের অনিয়ম শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নাইট শিফট কর্মীদের বাড়তি ঝুঁকি: বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, যারা নিয়মিত নাইট শিফটে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। রাতে কাজ ও দিনে ঘুমানোর ফলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়। এতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হজমের সমস্যা ও মানসিক চাপের ঝুঁকি বাড়ে।
কম বা বেশি ঘুম-দুটোই ক্ষতিকর: ৫ ঘণ্টার কম ঘুম যেমন উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়, তেমনি ৯ থেকে ১০ ঘণ্টার বেশি ঘুমও শরীরের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত ঘুম হৃদরোগ ও অলসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এজন্য স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমানো, বিকেলের ঘুম এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত ব্যায়াম করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। [সূত্র: টিডিএস]