ঘুমের সময় বদলালেই বদলাবে স্বাস্থ্য, কখন-কতক্ষণ ঘুমানো সবচেয়ে উপকারী
সব বয়সী মানুষের জন্য ঘুম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যস্ত জীবনে অনেকেই ঘুমকে তেমন গুরুত্ব দেন না। রাত জাগা, দেরিতে ঘুমানো বা অল্প ঘুম এসব যেন এখন স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ও মনের ওপর এর প্রভাব পড়ে নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে। তাই সুস্থ থাকতে হলে শুধু কতক্ষণ ঘুমানো হচ্ছে তা নয়, কখন ঘুমানো হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরীর মতে, ঘুম মানুষের শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার একটি মৌলিক উপাদান। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের তথ্যগুলো গুছিয়ে নেয়, স্মৃতিশক্তি মজবুত করে এবং শেখার ক্ষমতা বাড়ায়। একই সঙ্গে শরীরের কোষ মেরামত হয়, পেশী শক্তিশালী হয় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। কিন্তু ঘুম কম হলে এর প্রভাব সবচেয়ে আগে পড়ে মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে।
কম ঘুমের ফলে মনোযোগ কমে যায়, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, ছোট বিষয়ে বিরক্তি বা রাগ বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে উদ্বেগ, হতাশা এমনকি ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। শুধু তাই নয়, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় এবং শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। এতে ক্ষুধা বেড়ে যায়, ওজন বাড়ে এবং ডায়াবেটিসের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, ঘুমের প্রয়োজনীয়তা বয়সভেদে ভিন্ন হয়। নবজাতকের ক্ষেত্রে যেখানে দিনে ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন, সেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এই সময় কিছুটা বেশি, কারণ এ সময় তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ দ্রুত ঘটে। অন্যদিকে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের সময় কিছুটা কমলেও নিয়মিত ও মানসম্মত ঘুমের প্রয়োজনীয়তা থেকে যায়।
তবে শুধু সময়ের পরিমাণই নয়, ঘুমের সঠিক সময়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঘুমাতে যাওয়া সবচেয়ে উপকারী। এই সময় শরীরে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন নিঃসরণ বাড়ে এবং গভীর ঘুম সহজে আসে। বিশেষ করে রাত ১২টা থেকে ৩টার সময়টিকে ঘুমের সবচেয়ে কার্যকর অংশ হিসেবে ধরা হয়। এই সময় ঘুমাতে পারলে শরীর সবচেয়ে বেশি বিশ্রাম পায়।
অন্যদিকে, দেরি করে রাত ১২টার পর বা ২টার দিকে ঘুমানোর অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়িকে ব্যাহত করে। এতে সকালে উঠতে কষ্ট হয়, সারাদিন ক্লান্তি অনুভূত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে হরমোনজনিত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। ভোরে তাড়াতাড়ি ওঠার অভ্যাসও সুস্থ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সকাল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠলে শরীর সতেজ থাকে, মনোযোগ বাড়ে এবং দিনের কাজগুলো আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা যায়। এছাড়া দুপুরে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের স্বল্প সময়ের ঘুম বা ‘পাওয়ার ন্যাপ’ ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে, তবে দীর্ঘ সময় ঘুমালে তা রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, নিয়মিত ও নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। কারণ ভালো ঘুম শুধু শরীরকে বিশ্রাম দেয় না, এটি সুস্থতা, মানসিক স্থিতি এবং কর্মক্ষমতার মূল ভিত্তি তৈরি করে। [সূত্র: টিডিএস]