সকালে গরম পানি খাওয়া কি সত্যিই শরীরের জন্য ভালো?
‘প্রথমে আমার সোশ্যাল মিডিয়া ফিডে এটি আসে এবং একের পর এক ভিডিও দেখতেই থাকি। তারপর ভাবলাম, কেন চেষ্টা করে দেখছি না?’ এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন ২১ বছর বয়সী স্থাপত্য সহকারী মারিয়াম খান। মারিয়াম একা নন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী একটি বিশেষ প্রবণতায় ঝুঁকছেন, যা কোনো ব্যয়বহুল ত্বকচর্চা বা কঠিন ওয়ার্কআউট নয়; বরং স্রেফ সকালে এক গ্লাস গরম বা উষ্ণ পানি পান করা।
গরম পানি পানের উপকারিতা প্রাচীন চীনা চিকিৎসা পদ্ধতি ও ভারতের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে হাজার বছরের পুরনো ধারণা। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে 'নিউলি চাইনিজ' ও 'চাইনাম্যাক্সিং' হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে এই প্রাচীন অভ্যাসটি নতুন প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, তরুণ-তরুণীরা উষ্ণ পানি পান, গরম নাশতা এবং স্ট্রেচিংয়ের মাধ্যমে দিন শুরু করছেন।
চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতির একটি মূল বিশ্বাস হলো শরীরজুড়ে শক্তি বা ‘চি’ প্রবাহিত হয়। এই প্রবাহে বাধা এলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। সমর্থকদের মতে, ৪০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার উষ্ণ পানি পান করলে 'চি' আরও শক্তিশালী ও সংরক্ষিত হয়, যা দীর্ঘায়ু লাভে সহায়তা করে। ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসা গবেষক প্রফেসর শুন আউ-এর মতে, ‘সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ঠান্ডা খাবার খাওয়া মানে আপনার বাড়িতে ঠান্ডা বাতাস ঢোকার মতো।’ এই তত্ত্বের ভিত্তিতেই বাড়িতে উষ্ণ স্লিপার পরা বা সকালে গরম নাশতা খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং, কী স্বপ্ন দেখবেন তা ঠিক করে দিতে পারে যে কৌশল
লন্ডন প্রবাসী মারিয়াম খান জানান, কফির বদলে গরম পানি পান শুরু করার পর তিনি শারীরিক সতেজতা অনুভব করছেন। আগে কফি খাওয়ার পর যে বমিভাব হতো, তা এখন আর নেই। গরম পানিতে কখনও পুদিনা বা লেবু মিশিয়ে তিনি দিন শুরু করেন, যা তাকে মানসিকভাবেও শান্ত রাখে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন সেন্টারের অন্তর্বর্তী পরিচালক ড. শ্যামা কুরুবিলা জানান, আধুনিক চিকিৎসার প্রতি আস্থার সংকট এবং ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মানুষ এখন এসব পদ্ধতির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। জার্মানির এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের পরিপূরক বা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ব্যবহার করেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যেকোনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি অনুসরণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
লংজেভিটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. রোজি ব্রুকস জানান, গরম পানি পান করলে হজমে সামান্য উন্নতি হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়তা করে। এছাড়া এটি খাদ্যনালীর (ইসোফ্যাগাস) স্পাজম শান্ত করতে পারে। তবে লাইফস্টাইল ফিজিশিয়ান ড. সেলিনা গ্রে স্পষ্ট করেছেন যে, গরম পানি পান করলেই চর্বি পুড়বে বা বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) ম্যাজিকের মতো বেড়ে যাবে এমন দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মূল বিষয় হলো শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা, তা পানি ঠান্ডা হোক বা গরম।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গরম পানি পান করার বিষয়টি স্বাস্থ্যের চেয়েও বেশি একটি ‘রুটিন’ বা অভ্যাসের মতো। এটি মানুষকে ব্যস্ত জীবনের মাঝে কয়েক মুহূর্ত নিজের জন্য সময় দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। তাই-চি বা চিগং-এর মতো ধীরস্থির অনুশীলনের মতোই এটি মন ও শরীরের সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করে। মারিয়াম খানের ভাষায়, ‘আমি এটিকে ধীর চলার, চারপাশকে উপলব্ধি করার এবং কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে দিন শুরু করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখি।’ তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা