ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং, কী স্বপ্ন দেখবেন তা ঠিক করে দিতে পারে যে কৌশল
স্বপ্ন নিয়ে মানুষের কৌতূহল বহুদিনের। স্বপ্ন কোথা থেকে আসে, কেন মানুষ স্বপ্ন দেখে এবং এর অর্থ কী এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খুঁজে চলেছে। এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, খুব শিগগিরই শুধু স্বপ্নের ব্যাখ্যাই নয়, বরং মানুষ কী স্বপ্ন দেখবে সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।
ঘুম নিয়ে গবেষণায় যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা স্বপ্ন প্রকৌশল নামে একটি নতুন গবেষণাক্ষেত্র দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষেত্রের গবেষকদের ধারণা, ঘুমানোর ঠিক আগে মানুষের মনে কিছু নির্দিষ্ট চিন্তা বা সংকেত প্রবেশ করানো গেলে ঘুমের মধ্যে মানুষ কী ধরনের অভিজ্ঞতা পাবে, সেটিকে প্রভাবিত করা সম্ভব হতে পারে।
প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি মানুষের শেখার ক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং সৃজনশীলতা জাগিয়ে তুলতে পারে। শুধু তাই নয়, মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতেও এটি সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ব্রেইনট্রির বাসিন্দা লেখক ও শিল্পী উইল ডাউড নিজেকে একজন ‘আধা পেশাদার স্বপ্নদর্শী’ বলে মনে করেন। অবক্ষয়জনিত একটি রোগে তার দৃষ্টিশক্তি ও চলাফেরার ক্ষমতা প্রভাবিত হয়েছে এবং তিনি আর পড়তে পারেন না। এরপর তিনি ‘ড্রিম ইনকিউবেশন’ নামের একটি কৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।
ড্রিম ইনকিউবেশন হলো ঘুমানোর আগে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়, সমস্যা বা প্রশ্নের ওপর মনোযোগ দিয়ে স্বপ্নের বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করার কৌশল। এ জন্য তিনি ঘুমানোর সময় মস্তিষ্কে ছোট ছোট অডিও প্রম্পট পাঠানোর পদ্ধতি ব্যবহার করতেন।
ডাউড বলেন, ‘আমি কি সাহিত্যের মাধ্যমে আমার স্বপ্ন প্রোগ্রাম করতে পারি এই ভাবনাটাই ঘুরছিল মাথায়।’ ঘুমানোর সময় কবিতা পাঠের রেকর্ডিং ব্যবহার করে তিনি তার স্বপ্নকে জীবন্ত চিত্রকল্পে ভরা এক অভিজ্ঞতায় রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন। কখনো তিনি স্বপ্নে বন্যায় বিধ্বস্ত এক রহস্যময় শহর অতিক্রম করেছেন, কখনো চাঁদের আলোয় ঢেউয়ের ওপর দিয়ে শেয়ালের সঙ্গে দৌড়েছেন।
তিনি এই অভিজ্ঞতাকে ‘স্বপ্নে ইন্ধন যোগানো’র সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘আমি একে জেট প্লেনে ইন্ধন দিয়ে স্বপ্ন দেখার সঙ্গে তুলনা করতে চাই।’ তার ভাষায়, এই স্বপ্নগুলোই পরবর্তীতে তার নতুন বইয়ের ভিত্তি হয়ে উঠেছে এবং তাকে এক ধরনের মুক্তির অনুভূতিও দিয়েছে।
ড্রিম ইনকিউবেশন নতুন কোনো ধারণা নয়। প্রাচীন গ্রীক ও থাই সংস্কৃতিতেও মানুষ স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশ পাওয়ার জন্য মন্দিরে যেত। তবে স্বপ্নের বিষয়বস্তুকে প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রভাবিত করার গবেষণা তুলনামূলকভাবে আধুনিক।
আরও পড়ুন: টানা পাঁচ দিনের বজ্রসহ শিলাবৃষ্টির পূর্বাভাস
২০০০ সালের গোড়ার দিকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক রবার্ট স্টিকগোল্ড লক্ষ্য করেন, যারা টেট্রিস খেলতে খেলতে ঘুমাতে যান, তারা প্রায়ই স্বপ্নে পতনশীল জ্যামিতিক আকৃতি দেখেন। এই ঘটনাটি পরে ‘টেট্রিস এফেক্ট’ নামে পরিচিতি পায়।
বর্তমানে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং হার্ভার্ডের সঙ্গে কাজ করা গবেষক অ্যাডাম হার হোরোউইৎজ এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছেন, যার নাম ‘ডর্মিও’। এই যন্ত্র ঘুমানোর সময় মানুষের শারীরবৃত্তীয় সংকেত পর্যবেক্ষণ করে এবং কানে শোনা যায় এমন প্রম্পট দেয়, যা স্বপ্নের বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করতে পারে।
এক গবেষণায় ৭০ শতাংশের বেশি অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, ডর্মিও ব্যবহার করার পর তারা নির্দিষ্ট বিষয়ে স্বপ্ন দেখেছেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ড. হোরোউইৎজ জানান, শৈশবে মানসিক আঘাত পাওয়ার পর তিনি বারবার দুঃস্বপ্ন দেখতেন। তখন তার মা ঘুমের সময় ফিসফিস করে তাকে আশ্বস্ত করতেন, যা তার স্বপ্ন বদলে দিতে শুরু করে।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি), উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যার চিকিৎসায়ও ব্যবহার করা যেতে পারে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়-এর গবেষক পিলেরিন সিক্কা বলেন, অস্ত্রোপচারের পর অস্বাভাবিকভাবে ইতিবাচক স্বপ্ন দেখার অভিজ্ঞতা অনেক রোগীই জানিয়েছেন, যা চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে স্বপ্ন প্রকৌশল নিয়ে গবেষণা যত এগোচ্ছে, এর নৈতিক ব্যবহার নিয়ে বিতর্কও বাড়ছে। ২০২১ সালে মার্কিন বিয়ার ব্র্যান্ড কুর্স ‘ড্রিম ইনকিউবেশন’ নিয়ে একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করে, যেখানে দর্শকদের ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট দৃশ্য দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা সেই পণ্য নিয়ে স্বপ্ন দেখে।
এই ঘটনার পর অধ্যাপক স্টিকগোল্ডসহ কয়েকজন বিজ্ঞানী তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এবং বিজ্ঞাপনের জন্য এই কৌশল ব্যবহারের সমালোচনা করে একটি খোলা চিঠি দেন। এ বিষয়ে মোলসন কুর্স-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হার্ভার্ডের স্বপ্ন গবেষক ডেইরড্রে ব্যারেট মনে করেন, স্বপ্নে বিজ্ঞাপনের প্রভাব নিয়ে যেসব শঙ্কা তৈরি হয়েছে তার অনেকটাই অতিরঞ্জিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং শুধু একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়, বরং মানুষের জীবনের এক বড় অংশকে নতুনভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ মানুষ তার জীবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় ঘুমিয়ে কাটায়, আর সেই সময়টিও ভবিষ্যতে শেখা, সৃজনশীলতা এবং মানসিক সুস্থতার জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে।
এই প্রতিবেদনটি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস-এর ‘দ্য ডকুমেন্টারি’ অনুষ্ঠানের একটি পর্বের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।