কখনো ডান, কখনো বাম নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার এই অদলবদলের রহস্য কী?
সর্দি-কাশি বা মৌসুমি অ্যালার্জি হলে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি বেশ বিরক্তিকর। তখন নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়াই কষ্টকর হয়ে ওঠে। তবে আপনি হয়ত লক্ষ্য করেছেন সুস্থ থাকলেও গভীর শ্বাস নেওয়ার সময় কখনো মনে হয় এক নাক দিয়ে বাতাস বেশি ঢুকছে, অন্য নাক দিয়ে কম। অনেকে তখন ভাবেন হয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কিন্তু বাস্তবে এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। গবেষকদের মতে, দিনের মধ্যে বহুবার আমাদের নাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে এমনভাবে কাজ করে যে এক সময় একটি নাসারন্ধ্র দিয়ে বাতাস বেশি প্রবাহিত হয়, আর অন্যটি তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘নেজাল সাইকেল’।
কী এই নেজাল সাইকেল?
নেজাল সাইকেল হলো এমন একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যেখানে নাকের দুই পাশ পর্যায়ক্রমে সক্রিয় হয়। অর্থাৎ একসময় একটি নাসারন্ধ্র দিয়ে বেশি বাতাস প্রবেশ করে, কিছু সময় পরে অন্যটি সেই ভূমিকা নেয়। গবেষণা বলছে, আমরা জেগে থাকাকালে প্রায় প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর এই পরিবর্তন ঘটে। তবে ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হয়ে যাওয়ায় এই পরিবর্তনের হার কিছুটা কমে যায়।
কীভাবে কাজ করে এই প্রক্রিয়া?
নেজাল সাইকেলের দুটি প্রধান ধাপ রয়েছে
১. কনজেশন
এই ধাপে একটি নাসারন্ধ্রের ভেতরের টিস্যু সামান্য ফুলে ওঠে। ফলে ওই পাশ দিয়ে বাতাস কম প্রবাহিত হয়।
২. ডিকনজেশন
অন্য নাসারন্ধ্র তখন খোলা থাকে এবং সেই পাশ দিয়ে বেশি বাতাস প্রবাহিত হয়। যে নাসারন্ধ্র দিয়ে বেশি বাতাস যায়, সেটি কিছুটা ‘ক্লান্ত’ হয়ে পড়ে। কারণ বাতাস নাকের ভেতর শুকিয়ে দেয় এবং বিভিন্ন জীবাণুর সংস্পর্শে আনে। তাই নির্দিষ্ট সময় পরপর দুই পাশের ভূমিকা বদলে যায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশ অবচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
বাম নাক ও ডান নাকের প্রভাব
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক মানুষের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ডানহাতি মানুষের মধ্যে বাম নাসারন্ধ্র তুলনামূলক বেশি সক্রিয় থাকে। আরও কিছু গবেষণা বলছে ডান নাসারন্ধ্র সক্রিয় থাকলে শরীর তুলনামূলক বেশি সতর্ক বা চাপগ্রস্ত অবস্থায় থাকতে পারে। বাম নাসারন্ধ্র সক্রিয় থাকলে শরীর বেশি শান্ত ও স্বস্তির অবস্থায় থাকে
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নেজাল সাইকেল?
নেজাল সাইকেল আমাদের শরীরের জন্য কয়েকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নাকের সুরক্ষা: প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার লিটার বাতাস আমাদের নাক দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। ফলে নাক শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। নাসারন্ধ্রের পালাক্রমে সক্রিয় হওয়া নাকের ভেতরের টিস্যুকে অতিরিক্ত ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধার: বাতাসের সংস্পর্শে নাকের ভেতরের অংশ শুকিয়ে যেতে পারে। তাই একটি পাশ যখন কাজ করে, অন্য পাশ তখন কিছুটা বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়।
বাতাসকে উষ্ণ ও আর্দ্র করা: কনজেশন পর্যায়ে নাকের রক্তনালিতে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যায়। এতে বাতাস শরীরে ঢোকার আগে উষ্ণ ও আর্দ্র হয়ে যায়।
কোন কারণে নেজাল সাইকেল ব্যাহত হতে পারে?
বিভিন্ন কারণ এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সর্দি বা ফ্লু, অতিরিক্ত মিউকাস বা শ্লেষ্মা, অ্যালার্জি (পোলেন বা ধুলাবালি), উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ, দীর্ঘদিন নাক খোলার স্প্রে ব্যবহার, নাকের পলিপ। বিশেষ করে পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে ডিকনজেস্ট্যান্ট স্প্রে ব্যবহার করলে রাইনাইটিস মেডিকামেন্টোসা নামের এক ধরনের নাক বন্ধের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নাকের গঠনগত সমস্যাও কারণ হতে পারে
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নাকের গঠনগত সমস্যাও নেজাল সাইকেলকে বাধাগ্রস্ত করে।
নাকের পলিপ: যা প্রায় ৪ শতাংশ মানুষের মধ্যে দেখা যায়। ডেভিয়েটেড নেজাল সেপটাম: যেখানে নাকের মাঝের হাড় বা কার্টিলেজ একদিকে বেঁকে থাকে এ ধরনের সমস্যায় অনেক সময় শ্বাস নিতে অসুবিধা হয় এবং চিকিৎসার জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
ঘুমের ভঙ্গিও প্রভাব ফেলতে পারে
শুয়ে থাকা বা কুঁজো হয়ে বসার মতো সাধারণ বিষয়ও নেজাল সাইকেলকে প্রভাবিত করতে পারে। শুয়ে থাকলে মাধ্যাকর্ষণের কারণে নাকের এক পাশে রক্ত জমে যেতে পারে, ফলে একটি নাসারন্ধ্র বন্ধ মনে হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
সাধারণত সর্দি বা ফ্লুর কারণে নাক বন্ধ হলে তা এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। সাইনাসের সংক্রমণ হলে চার সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে যদি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে একটি নাক বন্ধ থাকে অস্বাভাবিক সর্দি বা নিঃসরণ দেখা যায় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সূত্র: [সিএনএন]