মাতৃদুগ্ধ পানে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ, প্রভাব ফেলছে ফর্মুলা দুধের বিজ্ঞাপন
মাতৃদুগ্ধ পান শিশুর বেঁচে থাকা, সুস্থ বৃদ্ধি এবং মস্তিষ্কের সর্বোত্তম বিকাশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ নবজাতকের জীবন বাঁচানো সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। জীবনের প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ এবং দুই বছর বা তার বেশি সময় তা চালিয়ে গেলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, শারীরিক বিকাশ সঠিকভাবে হয় এবং মানসিক বিকাশও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। একই সঙ্গে মা ও শিশুর মধ্যে গভীর বন্ধন তৈরি হয়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ এই সূচকে এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি, যা দীর্ঘমেয়াদে শিশুর বুদ্ধি বিকাশ ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইউনিসেফ দক্ষিণ এশিয়ার পুষ্টি বিষয়ক আঞ্চলিক উপদেষ্টা জিভাই মুরিরা এবং আঞ্চলিক পুষ্টি বিশেষজ্ঞ বাণী সেঠির সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে মাতৃদুগ্ধ রক্ষায় অনৈতিক বিপণন, নীতিগত দুর্বলতা এবং আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার জরুরি প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই দশকে মাতৃদুগ্ধ পানের হার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেলেও এখনো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। ২০০০ সালে এই অঞ্চলে প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ছিল ৪৭ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে প্রায় ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে এই হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ইতোমধ্যে পূরণ হলেও ২০৩০ সালের ৭০ শতাংশ লক্ষ্য এখনো অনেক দূরে।
বর্তমানে শ্রীলঙ্কা ও নেপাল এই সূচকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছে। নেপালে হার প্রায় ৬২ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। ভারতে এই হার প্রায় ৫৮ শতাংশ। আর বাংলাদেশে প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার প্রায় ৫৫ শতাংশে স্থবির হয়ে আছে। এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশে জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার মাত্র ৪৭ শতাংশ, যা শিশুর প্রাথমিক পুষ্টি নিশ্চিতকরণে বড় ঘাটতি তৈরি করছে।
জাতীয় পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধ পানের ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় মায়েরা তুলনামূলকভাবে বেশি হারে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ান। শহরে কর্মজীবী মায়েদের কর্মপরিবেশ, সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং স্বাস্থ্যসেবায় পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে বিকল্প দুধের ওপর নির্ভরতা বেশি দেখা যায়। সিজারিয়ান প্রসবের উচ্চ হারও শহরাঞ্চলে প্রথম ঘণ্টায় বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমার একটি বড় কারণ। পাশাপাশি বোতলজাত দুধ ও ফর্মুলা দুধ ব্যবহারের প্রবণতাও শহরে বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিজারিয়ান ডেলিভারি বৃদ্ধি, ভুল সামাজিক ধারণা, ল্যাকটেশন সহায়তার ঘাটতি এবং বাণিজ্যিক দুধ কোম্পানির আগ্রাসী বিপণন— সব মিলিয়ে মাতৃদুগ্ধ পানের ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি করছে। অনেক পরিবার এখনো মনে করে শালদুধ ক্ষতিকর, আবার অনেক মা পর্যাপ্ত দুধ না থাকার আশঙ্কায় দ্রুত ফর্মুলা দুধে চলে যান। হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরামর্শ ও সহায়তা না থাকাও একটি বড় সমস্যা। একই সঙ্গে ফর্মুলা দুধের বিজ্ঞাপন মায়েদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিশুর বিকল্প খাবার হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে ফর্মুলা দুধ ব্যবহার করা হলেও সচেতনতার অভাবে কিছু পরিবার গরুর দুধ, ছাগলের দুধ, চিনির পানি বা অন্যান্য তরল খাবারও ব্যবহার করে, যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষণায় দেখা যায়, জন্মের প্রথম ছয় মাসে এসব বিকল্প খাবার দেওয়া হলে শিশুর স্বাভাবিক পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাহত হয়।
মাতৃদুগ্ধ না পাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে বেশ কিছু ঝুঁকি দেখা যায়। গবেষণা বলছে, মায়ের দুধে থাকা DHA এবং ARA শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বুকের দুধ না পাওয়া শিশুদের কগনিটিভ বিকাশ তুলনামূলকভাবে দুর্বল হতে পারে। পাশাপাশি তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, ফলে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও অপুষ্টির ঝুঁকি বেড়ে যায়। ভবিষ্যতে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মাতৃদুগ্ধ পানের সুরক্ষায় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা গ্রহণ করেছে। ১৯৮১ সালের আন্তর্জাতিক কোড অনুযায়ী মায়ের দুধের বিকল্প পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত বিপণন সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশ এই নীতিমালা গ্রহণ করলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশে মায়ের দুধের বিকল্প পণ্যের নিবন্ধন ও লেভেল নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানে নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় বেসরকারি স্বার্থের প্রভাব কমানোর চেষ্টা চলছে। মালদ্বীপ ও ভুটানও নীতিগতভাবে কোড বাস্তবায়ন শক্তিশালী করার দিকে এগোচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন থাকলেই হবে না, কার্যকর তদারকি, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং কর্মজীবী মায়েদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাতৃদুগ্ধ পান শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক দায়িত্ব। পরিবার, চিকিৎসক, কর্মস্থল এবং সরকার— সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে প্রতিটি শিশুই জীবনের শুরুতে সঠিক পুষ্টি ও সুস্থ মানসিক বিকাশের সুযোগ পায়।