০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:১৬

বাংলাদেশকে এআই উদ্ভাবনে সক্ষম দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে

বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।  © বাসস

বাংলাদেশকে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং এ প্রযুক্তির প্রয়োগ ও উদ্ভাবনে সক্ষম দেশ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প ও বাণিজ্যসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এআইয়ের কৌশলগত ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর নিরাপদ ও দায়িত্বশীল প্রয়োগে গুরুত্ব দিতে হবে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির যৌথ উদ্যোগে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ এখন প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দেশের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নিষ্ক্রিয় অংশীদার না হয়ে সক্রিয় অংশীদার হতে হবে বাংলাদেশকে।

তিনি আরও বলেন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পের আধুনিকায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এআইকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে তারা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

আন্তর্জাতিক গবেষণায় আগামী কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে এআইয়ের মাধ্যমে ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশকেও এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনার পাশাপাশি এর ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এআইয়ের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির সম্প্রসারণ যেন নতুন করে বেকারত্ব সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, এআইয়ের নিরাপদ ব্যবহার ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রযুক্তি যেন মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রযুক্তি গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি জানান, সরকার মূল্যবোধকেন্দ্রিক জাতীয় এআই নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। এতে নৈতিকতা, মানবাধিকার, ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয় এআই সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে এআই শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম নির্ধারক। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে এআইয়ের অবদান প্রায় ১৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এআইবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে। এ প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার, তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা ও উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করতে জাতীয় এআই নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।

দেশীয় স্টার্টআপ ও গবেষকদের জন্য গবেষণা অনুদান, ইনকিউবেশন সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। সাধারণ মানুষকে কণ্ঠস্বরের নির্দেশনার মাধ্যমে ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে বাংলা ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং প্রযুক্তি তৈরির কাজ চলছে বলে জানান মন্ত্রী।

ফকির মাহবুব আনাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এআই ও মেশিন লার্নিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা হচ্ছে। তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, সরবরাহব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতে এআই ব্যবহারের জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ এম. রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী এআইয়ের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য তরুণ, উদ্যোক্তা ও গবেষকদের এআই, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং মেশিন লার্নিংয়ে দক্ষ করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, দেশে উদ্যোক্তাদের জন্য অবাধ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বাধা ও হয়রানি ছাড়াই যেন তাঁরা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, জীবপ্রযুক্তি ও রোবোটিকসের মতো অগ্রসর প্রযুক্তির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সমন্বিত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি, গবেষণার ফল বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো, স্টার্টআপ ও শিল্প খাতে উদ্ভাবনের সম্প্রসারণ এবং অগ্রসর প্রযুক্তিতে জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক রেডিনেস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেমস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাবেক অধ্যাপক আলমগীর হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ। অনুষ্ঠান শেষে রাষ্ট্রপতি অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে সম্মেলন প্রাঙ্গণে সামিট উপলক্ষে স্থাপিত বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। সামিটে দেশি-বিদেশি ১৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন প্রদর্শন করছে। পাশাপাশি ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও তরুণ উদ্ভাবকেরা নিজেদের এআই প্রকল্প তুলে ধরছেন।