০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৮:১৩

সমবায় ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান ফয়সল আহমেদ চৌধুরী: ত্যাগ ও সংগ্রামের স্বীকৃতি

ফয়সল আহমেদ চৌধুরী  © সংগৃহীত

কানাডা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ও দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফয়সল আহমেদ চৌধুরী বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, প্রবাসে দলীয় সংগঠন গড়ে তোলা এবং প্রতিকূল সময়ে বিএনপির পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখার অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমবায় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এলেন তিনি। বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ফয়সল।

গত ৩ নভেম্বর পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের এক অফিস আদেশে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। সিনিয়র সহকারী সচিব মো. তানভীর হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির পদ শূন্য হওয়ায় ফয়সল আহমেদ চৌধুরীকে ওই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আগে তিনি মৌলভীবাজার কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, ফয়সল আহমেদ চৌধুরী সিলেট বিভাগ ছাড়া অবশিষ্ট সাত বিভাগের সাতজন সদস্যের সমন্বয়ে সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালকের সঙ্গে পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি পুনর্গঠন করবেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের একটি রিট পিটিশনের আদেশ মোতাবেক আগামী ১৬ মে ২০২৭ সালের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে জারি করা আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথাও বলা হয়েছে।

দায়িত্ব পাওয়ার পর ফয়সল আহমেদ চৌধুরীর সামনে এখন দুটি বড় কাজ—অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি পুনর্গঠন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন। একই সঙ্গে সমবায় ব্যাংকের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে।

প্রবাসের রাজনীতি থেকে জাতীয় দায়িত্ব

দুই পাতা এক কুঁড়ির দেশ মৌলভীবাজারের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান ফয়সল আহমেদ চৌধুরী। তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। কানাডা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম এই নেতা সংগঠনটির তিনবারের সাবেক সভাপতি। দীর্ঘদিন ধরে দেশে ও প্রবাসে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি।

রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়গুলোতে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থাকার অভিজ্ঞতা তার পথচলার অন্যতম অংশ। বিশেষ করে ১/১১-এর রাজনৈতিক সংকটের সময় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মুক্তির দাবিতে কানাডায় সোচ্চার হন তিনি। কানাডার পার্লামেন্ট ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেন। প্রবাসে দলীয় আন্দোলন সংগঠিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু কানাডাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কানাডার ফেডারেল পার্লামেন্টের কয়েকজন সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে এসে বিএনপির জাতীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং দলীয় শীর্ষ নেতাদের হয়রানি ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানানোর ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক পথচলার উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলেও দেশে ও কানাডায় বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন ফয়সল। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা-হামলা ও নেতাকর্মীদের হয়রানির সময়ে দলীয় অবস্থানের পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর অনুসারীদের ভাষ্য, কঠিন সময়েও দলীয় আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ধরে রেখে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন তিনি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্নেহ ও আস্থা অর্জন করেছেন বলেও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। জিয়া পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে তাঁরা রাজনৈতিক আনুগত্য ও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেন।

স্থানীয় সমবায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে

রাজনীতির পাশাপাশি সমবায় সংগঠক হিসেবেও কাজ করেছেন ফয়সল আহমেদ চৌধুরী। মৌলভীবাজার কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার তাঁকে বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া হলো। স্থানীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাঁর সামনে।

সমবায় ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত সাধারণ সদস্য, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা হবে নতুন কমিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়টি তার দায়িত্বের অন্যতম প্রধান অংশ।

ফয়সল আহমেদ চৌধুরীর এই নিয়োগকে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ ও সাংগঠনিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক দুঃসময়ে যারা দলের পাশে ছিলেন, দায়িত্বশীল অবস্থানে তাদের মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় তার নতুন দায়িত্বকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তারা।

তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নতুন দায়িত্বে তার সাফল্য নির্ভর করবে সমবায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, সদস্যদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের ওপর। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সমবায় খাতের বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, এখন সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।