২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:২৯

ই-টিন থাকলেই গুনতে হচ্ছে জরিমানা, যা জানা যাচ্ছে

প্রতীকী ছবি   © সংগৃহীত

ই-টিন (e-TIN) নিবন্ধন থাকার পর আয়কর রিটার্ন জমা না দেওয়ায় সবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন তথ্যে আপনিও বিভ্রান্ত হয়েছেন নিশ্চয়। তবে বিষয়টা এমন নয়। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণে করদাতার পূর্ববর্তী আয় নিরূপণ ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতিসহ প্রাসঙ্গিক আইনগত বিধান বিবেচনা করা হয়। যে কারণে ই-টিন থাকলেই আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানার আওতায় পড়বেন না। 

আইনের ২৬৬ ধারা অনুযায়ী, আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি—এমন করদাতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা ৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে, আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা—এই দুইয়ের মধ্যে যেটি বেশি, সে অনুযায়ী জরিমানা নির্ধারণের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ন্যূনতম ১ হাজার টাকা জরিমানা এবং রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানার বিধানও রয়েছে।

কারা আয়কর রিটার্ন জমা দিতে বাধ্য?

শুধু ই-টিন থাকা কিংবা আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন জমা দিতে হয়।

তাদের মধ্যে রয়েছেন—

১. যাদের বার্ষিক মোট আয় সরকারের নির্ধারিত করমুক্ত সীমার বেশি।

২. ফার্মের অংশীদার এবং কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী।

৩. সরকারি চাকরিজীবীসহ আইন দ্বারা নির্দিষ্ট বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির ব্যক্তি।

৪. ব্যাংক ঋণ বা ক্রেডিট কার্ড নেওয়া, জমি বা সম্পত্তি নিবন্ধন এবং নির্দিষ্ট কিছু সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যাদের আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বা স্লিপ দাখিল করতে হয়।

ই-টিন আছে, কিন্তু আয় নেই—করণীয় কী?

বিভিন্ন প্রয়োজনে ই-টিন নেওয়ার পর কেউ কেউ বর্তমানে আয়হীন হয়ে পড়েছেন, আবার কারও আয় করযোগ্য সীমা অতিক্রম করে না। তবে আয় কমে যাওয়া কিংবা বর্তমানে কর দিতে না হওয়া মানেই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

প্রযোজ্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে টিআইএন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর অফিসে আবেদন করা যেতে পারে। তবে আবেদন অনুমোদন হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করে।

নিজের নামে বকেয়া রিটার্ন বা কোনো নোটিশ রয়েছে কি না, তা জানতে এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টাল etaxnbr.gov.bd-এ লগইন করে অবস্থা যাচাই করা যেতে পারে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল অফিসের সঙ্গেও যোগাযোগ করা উচিত।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা কত?

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, নতুন আয়কর কাঠামোয় বিভিন্ন শ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে—

- সাধারণ পুরুষ করদাতা: ৪ লাখ টাকা।
- নারী ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিক: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
- প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা: ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
- গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইযোদ্ধা: ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

সাধারণ করদাতাদের জন্য প্রস্তাবিত কর স্ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত। পরবর্তী ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, এর পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য। অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ করের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রদত্ত তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। নতুন কাঠামোয় তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনের চূড়ান্ত প্রযোজ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি প্রজ্ঞাপন ও এনবিআরের নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।

করদাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

ই-টিন থাকা, করযোগ্য আয় থাকা এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা—তিনটি বিষয় এক নয়। একইভাবে, রিটার্ন জমা না দিলেই প্রত্যেককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে—এমন ধারণাও সঠিক নয়। জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণে প্রযোজ্য আইন ও করদাতার পরিস্থিতি বিবেচ্য।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের ভিত্তিতে আতঙ্কিত না হয়ে নিজের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা, বকেয়া অবস্থা এবং প্রযোজ্য আইন যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।