নতুন পে স্কেলে ৫ বছরে পেনশন ব্যয় বাড়তে পারে ৪ গুণ
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ পুরোপুরি কার্যকর হলে আগামী পাঁচ বছরে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ব্যয় বেড়ে ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এতে জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরির আশঙ্কা করছে জাতীয় বেতন কমিশন। পেনশনভোগীদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের দীর্ঘ সময় ধরে পেনশন দেওয়ার কারণে এ ব্যয় বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় টেকসই সংস্কার এবং নতুন নিয়োগ পাওয়া সরকারি কর্মচারীদের জন্য চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে কমিশন।
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ৫৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ বা এক গ্রেড এক পেনশন ব্যবস্থা চালু করে ২০৩০ সালের মধ্যে তা পুরোপুরি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন স্কেল অনুমোদনের পর পেনশনভোগীদের জন্য নেওয়া সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।
জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে পেনশনভোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৫ সালের বেতন কাঠামো অনুযায়ী, গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পেনশন খাতে ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ওই বছরে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৪ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯ লাখ ১৬ হাজার পেনশনভোগীর জন্য বার্ষিক পেনশন ব্যয় বেড়ে ৩৪ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা হবে। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে পেনশনভোগীর সংখ্যা বেড়ে ১০ লাখ ৪৫ হাজারে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে পেনশন ব্যয় বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা।
কমিশন বলেছে, পেনশনের দাবি মেটাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয় জাতীয় বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। দীর্ঘ মেয়াদে এ চাপ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় টেকসই সংস্কার প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্তদের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরা ২০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে পেনশন পাচ্ছেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে পেনশন পরিশোধের আর্থিক দায় সরকারের ওপর বাড়ছে।
বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ‘ডিফাইন্ড বেনিফিট’ বা নির্ধারিত সুবিধাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থায় চাকরির সময় কর্মচারীদের পেনশন খাতে কোনো চাঁদা দিতে হয় না। পেনশনের পুরো দায় মেটানো হয় সরকারের রাজস্ব তহবিল থেকে।
অবসরের পর কর্মচারীরা সর্বশেষ মূল বেতনের ৯০ শতাংশের ভিত্তিতে মাসিক পেনশন পান। এর সঙ্গে অবসর-পরবর্তী ছুটির সুবিধাও দেওয়া হয়। প্রায় ৯০টি স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পেনশন ব্যয়ের বড় অংশ সরকারি অনুদানের মাধ্যমে মেটানো হয়।
কমিশন জানায়, আগামী বছরগুলোতে এ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। পেনশন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দিতে বিদ্যমান ব্যবস্থায় সংস্কার আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ অধিকাংশ উচ্চ আয়ের দেশ এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলো ‘ডিফাইন্ড কন্ট্রিবিউশন’ বা নির্ধারিত চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থায় চলে গেছে।
এ ব্যবস্থায় কর্মচারী ও নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের চাঁদা জমা করে একটি তহবিল গঠন করা হয়। পরে সরকারি সিকিউরিটিজ, শেয়ারবাজার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো তুলনামূলক কম ঝুঁকির খাতে ওই অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। তহবিলের অর্থ ও বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয় দিয়ে পেনশন দেওয়া হয়।
বিভিন্ন দেশের পেনশন ব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরে কমিশন জানিয়েছে, শ্রীলঙ্কায় কর্মচারীরা বেতনের ৮ শতাংশ এবং সরকার ১২ শতাংশ চাঁদা দেয়। পাকিস্তানে কর্মচারীদের চাঁদা ১০ শতাংশ, সরকার দেয় ১২ শতাংশ। ভারতে কর্মচারীরা ১০ শতাংশ এবং সরকার ১২ থেকে ১৪ শতাংশ চাঁদা দেয়। অস্ট্রেলিয়ায় বেতনের অন্তত ১২ শতাংশ পেনশন তহবিলে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার পেনশন সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৩৩ ট্রিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার। এটি বিশ্বের বৃহত্তম পেনশন তহবিলগুলোর একটি।
সরকারি কর্মচারীরা গড়ে ৩০ বছর বা তারও বেশি সময় চাকরি করেন উল্লেখ করে কমিশন বলেছে, চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালু হলে এ তহবিল দেশের পুঁজিবাজার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৭ কোটি মানুষের দেশে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের একটি অভিন্ন চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে বিপুল দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তহবিল গড়ে উঠবে। এতে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।