এখনও অন্ধকারে ‘ঢাকা’! কেন না জানিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড দিল সৌদি আরব
সৌদি আরবে বাংলাদেশকে না জানিয়ে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই দাবি করছেন, এ ঘটনায় সরকারের দিক থেকে যথাযথ কূটনৈতিক যোগাযোগের ঘাটতি ছিল , অনেকেই আবার বলছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের শ্রমের মর্যাদা নেই। এদিকে বাংলাদেশ সরকার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রকৃত কারণ চেয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর চিঠি পাঠিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি কারাগারে আটক থাকার পর গত ১৪ অক্টোবর নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সিতি আখতার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে জানায় সৌদি কর্তৃপক্ষ। তবে এ বিষয়ে আগে থেকে বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দা কনস্যুলেটকে জানায়নি সৌদি আরব। এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট।
সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতির বরাতে দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ ছিল। নজরুলকে সাইবার অপরাধ আইনে এবং সিতি আখতারকে ‘ব্যভিচারের’ অভিযোগে আটক করা হয়েছিল বলে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের একটি গোপনীয় চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১৮ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট নজরুলকে সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে আটক করা হয়। পরদিন ব্যভিচারের অভিযোগে আটক হন সিতি। দুজনই ‘আল মাজাল কোম্পানিতে’ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। নজরুল ছিলেন জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং সিতি ছিলেন জেদ্দা মহিলা কারাগারে।
কনস্যুলেটের কাছে থাকা ৩০ সেপ্টেম্বরের বন্দি তালিকায় তাঁদের নাম থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের সাজার কথা উল্লেখ ছিল না। তালিকায় সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের সাজার বিবরণ দেওয়ার নির্ধারিত ঘরেও তাঁদের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে চিঠিতে জানানো হয়।
মৃত্যুদণ্ডের খবর পরিবারও আগে জানত না
নজরুলের পরিবারের অভিযোগ, তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের কিছুই জানানো হয়নি। পরিবারের সদস্যদের বরাতে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তিন দিন আগে, ১১ অক্টোবর পরিবারের সঙ্গে শেষবার কথা বলেন নজরুল।
নজরুলের বাবা আব্দুল বশির দীর্ঘদিন সৌদি আরবে কাজ করেছেন। ছেলের মৃত্যুদণ্ডের খবর জানার পর তিনি ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান তাঁরা।
পরিবারের সদস্যরা আরও অভিযোগ করেছেন, নজরুলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে তাঁর দুই আত্মীয় মোস্তাকিম ভুঁইয়া ও ইমাম হাসান ভুঁইয়া এক পাকিস্তানি সহকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তবে অভিযোগটির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হয়নি।
অন্যদিকে, সিতি আখতার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। নজরুলের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করা হয়েছে। যদিও সংবাদমাধ্যমে পরিবারের এক সদস্যের বরাতে ভিন্ন বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বিবরণ না পাওয়ায় তাঁদের সম্পর্ক ও ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি ‘নোট ভার্বাল’ পাঠিয়ে রায়ের অনুলিপি ও মামলার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
কনস্যুলেটের চিঠিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের আদালতগুলোতে শুনানির সময় অনুবাদের জন্য নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হয়। তবে নজরুল ও সিতির বিচার চলাকালে তাঁদের পক্ষে দোভাষী বা আইনি প্রতিনিধি ছিলেন কি না, সে বিষয়ে চিঠিতে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
এদিকে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার বা আটক করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের কনস্যুলার কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার বিধান রয়েছে। এ ঘটনায় ওই বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে কিছু জানায়নি। গণমাধ্যমের খবর থেকেই তাঁরা বিষয়টি জানতে পেরেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে ঘটনার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে বলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশের আরেক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে ঘটনার আইনি দিক আরও স্পষ্ট হবে।
সৌদিতে আটক বাংলাদেশিদের পরিস্থিতি
জেদ্দা কনস্যুলেটের আওতাধীন সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারগুলোতে বিভিন্ন ধরনের চারিত্রিক মামলায় ৩০৬ বাংলাদেশি আটক রয়েছেন বলে কনস্যুলেটের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। এসব সাজা এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অন্যদিকে, সাইবার বা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অপরাধে মক্কায় তিনটি পৃথক মামলায় আসামিদের ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে চিঠিতে জানানো হয়। কনস্যুলেটের তথ্য অনুযায়ী, সাইবার অপরাধ ও ব্যভিচারের অভিযোগে বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির আগে জানা ছিল না।
নজরুল ও সিতির মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পর তাঁদের দাফন করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি, মামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতের দেওয়া চূড়ান্ত রায়ের অনুলিপি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
কূটনৈতিক সম্পর্কে কী প্রভাব পড়বে?
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক কর্মী জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে যান। দেশটিতে তাঁরা নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতাসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করেন। ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার, আইনি সুরক্ষা এবং কনস্যুলার সহায়তা দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমন পরিস্থিতিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ঢাকাকে অবহিত না করার অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা বন্দি তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের তথ্য না থাকা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানানোর বিষয়টি উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌদি আরব সফর সামনে রেখে ঘটনাটি দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। তবে এ ঘটনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, মামলার নথি এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক পদক্ষেপের পরই পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।