২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:১৮

আগে আওয়ামী লীগ যা করত, এখন বিএনপি তাই করছে: জামায়াত

জামায়াতের জরুরি সংবাদ সম্মেলন  © সৌজন্যে প্রাপ্ত

সরকারের সাত মাসে সমন্বয়হীনতা, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করছে—তা হাস্যকর বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াত ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, আগে আওয়ামী লীগ যা করত, এখন বিএনপি তাই করছে। সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না, ওয়াজ মাহফিল করতে দেওয়া হচ্ছে না। লাখো ভোটে নির্বাচিত এমপিকে ঠেকাতে না পেরে ওয়াজ মাহফিলের অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ এ ধরনের কাজ করেছে বলেও সতর্ক করেন তিনি। রাজশাহীর সম্মেলন বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদের পথ থেকে ফিরে আসুন।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বেলা ১২টায় সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য তুলে ধরেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জুলাইকে ধারণ করে না—বিএনপির এমন অভিযোগ হাস্যকর। জামায়াতে ইসলামীই জুলাইকে ধারণ করে। সরকার জুলাইকে ধারণ না করায় তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না। তারা সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসাচ্ছে। তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সাংবিধানিক পদ, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও যুবদলের লোকদের বসাচ্ছে। জামায়াতসহ ১১ দল জুলাইকে ধারণ করে বলে জনগণের দাবি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করছি। বিএনপি জুলাইকে ধারণ করে না বলে গণভোটকে অস্বীকার করছে। গণভোটকে বাতিল করেছে। তা বাস্তবায়নে টালবাহানা করছে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, মাওলানা আবদুল হালিম; সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. আব্দুর রব, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি; কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান; মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার।

তিনি বলেন, জুলাই চেতনার বাইরে তারা পদক্ষেপ নিচ্ছে। সম্প্রতি সরকারি কর্মকমিশনে তারা হাত দিয়েছে। সেখানে তারা চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে পিএসসির চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য সদস্যদের পদত্যাগের কথা বলছেন। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা এই দলীয়করণের বিরুদ্ধে চব্বিশের আন্দোলনে নেমে এসেছিল।

গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই আহতদের চিকিৎসার জন্য আমীরে জামায়াত পাশে ছিলেন। সারা বিশ্বে জামায়াতে ইসলামী নিজস্ব চেষ্টায় জুলাই শহীদদের স্মৃতি তুলে ধরতে এবং সংরক্ষণের জন্য তিনটি ভাষায় (বাংলা, ইংরেজি ও আরবি) বই প্রকাশ করেছে। সরকারের কোটি কোটি টাকার তহবিল থাকার পরও কোনো উদ্যোগ নেই। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের বেতন হচ্ছে না। তারা আমাদের কাছে অভিযোগ করছেন।

তিনি বলেন, বিএনপি তাদের নোট অব ডিসেন্টের ওপর অনড় থাকতে গিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, যা ফ্যাসিবাদী। তারা নিজেদের মতো বিশেষ কমিটি করে সংবিধান সংস্কার না করে সংশোধনের পথে যাচ্ছে। তারা ভিন্নমত গ্রহণ করতে পারেনি, স্যাক্রিফাইস করেনি। জামায়াতের পাঁচটি নোট অব ডিসেন্টের ওপর তারা শক্ত থাকেনি। বিএনপি ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্রকাঠামোকে রাখতে তাদের নোট অব ডিসেন্টের ওপর অটল থাকছে। সংবিধান সংস্কার না করে যেভাবে রাখা হচ্ছে, তাতে যে প্রধানমন্ত্রীই আসবেন, তিনিই ফ্যাসিবাদী হবেন।

ওসমানী উদ্যানে অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতার যোগদানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, ওই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে নাম উল্লেখ না করা অসম্মানজনক। অথচ প্রতিমন্ত্রীদের নাম কার্ডে উল্লেখ করা হয়েছে। রুলস অব প্রেসিডেন্স অনুযায়ী, তিনি একজন পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদার অধিকারী। কিন্তু আমন্ত্রণপত্রে যথাযথ সম্মান না দেওয়ার কারণে তিনি অনুষ্ঠানে যাননি। ফলে আমরা এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি। প্রধানমন্ত্রী যে অসত্য ও হাস্যকর তথ্য তুলে ধরেছেন, আমরা তার নিন্দা জানাই।

তিনি বলেন, আমরা যদি সরকারের দুর্নীতি ও দলীয়করণ নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা নাকি রাষ্ট্রের বিরোধিতা করি। তারা এসব বলে একদলীয় কর্তৃত্ব কায়েম করার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদকে ও আওয়ামী লীগকে ফেরার পথ করে দিচ্ছে। বিরোধী দল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে সেটিকে জুলাইবিরোধী আখ্যা দিয়ে নিজেদের দলীয়করণ ও ব্যর্থতা আড়াল করার জন্য জুজুর ভয় দেখিয়ে সব দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা ফ্যাসিস্টদের কখনো আসার সুযোগ করে দিচ্ছি না। বরং সরকার বিরোধী দলের সমস্ত আন্দোলনকে উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে যে অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে, এ পথ দিয়ে সরকার ইচ্ছা করে আওয়ামী লীগকে ঢোকার পথ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার।

সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের সহযোগিতা লাগবে কেন—এমন প্রশ্ন তুলে পরওয়ার বলেন, জনগণ গণভোটে প্রায় ৭০ ভাগ ভোট দিয়ে সংবিধান সংস্কারের রায় দিয়েছে। তারা সংস্কার না করে জনগণকে বাইপাস করে সংবিধান সংশোধন করতে চায়। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সরকার অসত্য তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার তীব্র নিন্দা জানান তিনি।

সরকার ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ফ্যাসিজম শিখেছে আওয়ামী লীগকে দেখে। কিন্তু রিজভী সাহেব সাত মাসেই তা ভুলে গেছেন। ফ্যাসিস্ট চিনতে হলে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে। চাঁদাবাজি, লুটতরাজ, সরকারি পদে দলীয় লোক বসানোই ফ্যাসিবাদের পথ। জনগণের রায় উপেক্ষা করা ফ্যাসিবাদের পথ। গণভোটের রায় না মানা ফ্যাসিবাদের পথ। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গণরায় উপেক্ষা করা ফ্যাসিবাদের পথ। নিজের দলের জুলাই আহতদের জিজ্ঞেস করলেই ফ্যাসিবাদের পথ চিনতে পারবে বিএনপি। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে সেটিকে ফ্যাসিবাদের পথ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো জোট করিনি। যেমন চারদলীয় ও বিশদলীয় জোট করা হয়েছে বিএনপির সঙ্গে। আমরা জামায়াতের প্রস্তুত করা কেয়ারটেকার সরকারের ফর্মুলা বাস্তবায়নের দাবিতে জাতীয় পার্টি, বাম দলসহ অনেক দলের সঙ্গে আন্দোলন করেছি। বিএনপি গণবিরোধী অবস্থানের কারণে ৯৬ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। বিএনপির কারণেই আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেছিল। সে সময় স্বচ্ছ নির্বাচনের দাবিতে জনগণ আন্দোলন করেছিল। মাগুরা মার্কা নির্বাচন করেছে বিএনপি। ক্ষমতায় গিয়ে ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্রশিবিরকে উৎখাত করেছে। আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাঁটিনি। জনগণের দাবি আদায় করতে আমরা একত্রে আন্দোলন করেছি।

তিনি বলেন, মাদরাসাগুলোর ম্যানেজিং কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে। সরকার ফ্যাসিবাদী চিন্তায় দলীয় লোকদের বসাতে কমিটি ভেঙে দিয়েছে। গত ১৭ বছর শেখ হাসিনা এ পথেই হেঁটেছেন, পরে দিল্লি চলে গেছেন বলেও রিজভীকে স্মরণ করিয়ে দেন গোলাম পরওয়ার।

সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকারের কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ থেকে বিরোধী দলের এমপিদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। অনির্বাচিত নারী এমপিদের নির্বাচিত এমপিদের ওপর দারোগাগিরি করতে বসানো হয়েছে। এটি ফ্যাসিবাদের পথ। আমরা অসংলগ্ন আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। ভবিষ্যতে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতার বিষয়ে আর যেন কোনো অসত্য তথ্য জাতির কাছে তুলে না ধরা হয়, সেই আহ্বান জানাই।