১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৩৪

আমন্ত্রণ পেয়েও ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধনে আসেনি বিরোধী দল, কঠোর সমালোচনা প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান   © টিডিসি ছবি

‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েও বিরোধী দলের নেতারা অংশ না নেওয়ায় তাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিরোধী দল সত্যিকার অর্থে জুলাইকে ধারণ করলে শহীদদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকত। সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মত্যাগকারীদের প্রতি সম্মান জানাতে তাদের অনুষ্ঠানে আসা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলম উপস্থিত ছিলেন।

স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী সেখানে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। এরপর তিনি আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যান উদ্বোধন করে এর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। পরে তিনি একটি আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন।

বিরোধী দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের এই অনুষ্ঠানটি জুলাইয়ের আত্মত্যাগকারী মানুষদেরকে নিয়ে। সরকারের পক্ষ থেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যারা তাদেরকে যেমন দাওয়াত দেয়া হয়েছে, ঠিক একইভাবে বিরোধীদলের নেতাসহ বিরোধীদলের যারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তাদেরকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছে।’

বিরোধী দল সত্যিকার অর্থে জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করলে অনুষ্ঠানে অংশ নিত বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি সত্যিকারভাবে জুলাইকে ধারণ করতেন তাহলে এখানে এসে জুলাই শহীদদের মানুষগুলোর সাথেও তো বসতে পারতেন। কোথায়? আমরা তো আজকে আপনাদেরকে দেখছি না। সরকারের সাথে আপনাদের দূরত্ব আছে, থাকুক দূরত্ব। কোনো সমস্যা নাই। যদি দূরত্ব আপনারা রাখতে চান কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু যেই মানুষগুলোর জন্য আজকে আপনারা বিরোধীদলের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, যেই মানুষগুলো জীবন উৎসর্গের কারণে, যেই মানুষগুলো আহত হওয়ার কারণে, যে মানুষগুলো চোখ হারানোর কারণে আজ আপনারা বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেছেন, বিরোধীদলের সংসদ সদস্য হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেছেন। সেই মানুষগুলোর মাঝেও তো আমরা আপনাদেরকে দেখতে পাচ্ছি না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেও ধারণ করে। তিনি বলেন, ‘আজকে অনুষ্ঠানটি আমরা করছি কাদেরকে নিয়ে? জুলাইতে যারা শহীদ হয়েছেন সেই শহীদদেরকে ঘিরে। হ্যাঁ, সরকার একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে শহীদদেরকে নিয়ে। বিএনপি সবসময় বলে, বিএনপি জুলাইকে ধারণ করে। বিএনপি যেভাবে ৭১-কে ধারণ করে, ঠিক একইভাবে জুলাইকেও ধারণ করে।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘সেজন্যই আপনারা দেখেছেন সরকার গঠন করার পর থেকে বিএনপি চেষ্টা করেছে জুলাইতে যেসব যোদ্ধা আহত হয়েছেন, পর্যায়ক্রমে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে। জুলাইতে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবারের মানুষগুলোকে, স্বজনদেরকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বিএনপি সরকার করে যাচ্ছে।’

বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মানুষ দেখছে যে, বিরোধীদল বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করে যাচ্ছে। ঠিক আছে, বিরোধিতা আপনারা করেন। কিন্তু আজকে বিরোধিতা করতে গিয়ে আপনারা যদি স্বৈরাচারকে আসার পথ উন্মুক্ত করে দেন তাহলে অবশ্যই সেটি দেশের জন্য কোনো ভালো পরিণাম বয়ে আনবে না। সেটি যেমন জুলাইয়ের শহীদদের সাথে গাদ্দারি করা হবে, একইভাবে ৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেও গাদ্দারি করা হবে।’

বক্তব্যে পরিবেশ সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সময় পুরোনো বড় গাছ কেটে ফেলা হয়ে থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি ভবিষ্যতে স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকৃতির ক্ষতি যতটা সম্ভব কমানোর আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন যে এটিকে তৈরি করতে গিয়ে খুব সম্ভবত অনেকগুলো অনেক পুরনো বড় বড় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। যারা এই স্থাপত্য শিল্পের সাথে সম্পর্কিত আছেন ভবিষ্যতেও বিভিন্ন স্থাপত্য গড়ে তুলবেন তাদের কাছে আমার আহ্বান থাকবে, আসুন আমরা চেষ্টা করি যতটুকু সম্ভব প্রকৃতিকে নষ্ট না করে বা প্রকৃতিকে আঘাত না করে স্থাপত্য শিল্প গড়ে তুলব।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অবশ্যই এগুলো বানাতে হবে। মানুষের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে আমাদেরকে এগুলো তৈরি করতে হবে। কিন্তু তারপর প্রকৃতিকে যদি আমরা সুরক্ষিত রাখতে পারি, সেটি দিনশেষে আমাদেরই উপকারে আসবে।’

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপরও জোর দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘পত্রপত্রিকা খুললেই আমরা এখন দেখছি ডেঙ্গুর বিষয়টি। ডেঙ্গুতে বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং একই সাথে নিশ্চয়ই আপনারা খেয়াল করেছেন গত প্রায় দেড় মাস ধরে সরকারের পক্ষ থেকে আমরা বহু মানুষকে সাথে নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালু রেখেছি; যাতে করে এই ডেঙ্গুকে আমরা প্রতিরোধ করতে পারি।’

এডিস মশা দল-মত চেনে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সরকার গঠন করার পরে প্রথম প্রথম কয়েকদিন খুব দেখলাম ফজরের নামাজের পরে কারা যেন গিয়ে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছে, এখন আর আমরা সেটি দেখতে পাই না।’

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে ৯০ ফুট উঁচু ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করা হয়েছে। এর গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।

স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু এবং ভেতরের দিকে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে সাত ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য রয়েছে। এসব ভাস্কর্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

এদিকে, রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান আধুনিকায়ন করা হয়েছে। উদ্যানটিকে সবুজ, নিরাপদ ও আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন গাছ লাগানো ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে।

উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং এবং জলাশয়ের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সেখানে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটিতে সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথও রয়েছে।