১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:১৭

এখানেই পদত্যাগ করবেন ইশরাক, প্রস্তুত মঞ্চ

ইশরাক হোসেন  © টিডিসি সম্পাদিত

জাতীয় প্রেস ক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে আসছেন ইশরাক হোসেন। এ উপলক্ষে প্রস্তুত রাখা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনকক্ষ। সেখানে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত হয়েছেন। বাইরে ভিড় করেছেন ইশরাকের নেতা-কর্মীরাও।

এর আগে, সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে পদত্যাগের ঘোষণা দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।

পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আজ দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেব এবং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হব, ইনশাআল্লাহ।’

ইশরাক আরও লেখেন, ‘ফেসবুকে কিছু সুশীল মানুষকে উল্লাসসূচক লেখালেখি করতে দেখলাম। আশা করি, ভবিষ্যতে কখনো আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হলে তারা জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসে সেই আন্দোলনে যোগ দেবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ। পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি আরও জোরদার হবে। দেশব্যাপী প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা সফর করতে পারব। মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল! মাদক নির্মূল, মাদক নির্মূল!’

পড়াশোনা যুক্তরাজ্যে, রাজনীতিতে বর্ণিল ক্যারিয়ার ইশরাকের
বিএনপির রাজনীতিতে পারিবারিক ঐতিহ্য, যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা, পুরান ঢাকায় রাজনৈতিক সক্রিয়তা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়—সব মিলিয়ে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক পথচলা নানা ঘটনা ও আলোচনায় পরিপূর্ণ। প্রয়াত বিএনপি নেতা ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে হিসেবে রাজনীতিতে পরিচিতি পেলেও সময়ের সঙ্গে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। 

ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের জন্ম ১৯৮৭ সালের ৫ এপ্রিল। বাবা সাদেক হোসেন খোকা এবং মা ইসমত আরা। একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া ইশরাকের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে রাজধানী ঢাকায়। তিনি ঢাকার ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কলাস্টিকা থেকে ‘ও’ লেভেল ও ‘এ’ লেভেল সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারে ভর্তি হন। সেখানে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

২০১১ সালে পড়াশোনা শেষ করার পর কিছু সময় যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন ইশরাক। এ সময় দেশটির বিভিন্ন স্থানীয় মোটরগাড়ি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রেসক্লাবের এই কক্ষেই হবে সংবাদ সম্মেলন

ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন তার বাবা সাদেক হোসেন খোকা। তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা, সাবেক মন্ত্রী এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। বাবার রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করেই ইশরাক সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।

সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শুরু হয় ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিয়ে। ওই নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে পরাজিত করেন। পরে বিএনপি সরকারে তিনি ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের মৎস্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। এর আগে ও পরে ঢাকার রাজনীতিতে তার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০০২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু বিএনপির জন্য বড় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়। বাবার মৃত্যুর পর পুরান ঢাকার রাজনীতিতে ইশরাকের সক্রিয়তা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তিনি বিএনপির নগর রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে ইশরাক হোসেন বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের যুক্তরাজ্য শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম দলের আহ্বায়ক হন। বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

রাজনীতি ছাত্রজীবন থেকেই, শিকার হামলা-মামলার
ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ইশরাক শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। নাশকতার মামলায় তাকে কারাগারেও যেতে হয়েছিল। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আন্দোলনে সক্রিয় হন তিনি। বিভিন্ন সময়ে পুলিশি হামলায় তার আহত হওয়ার ঘটনাও সামনে আসে।

বাবার মৃত্যুর পর পুরান ঢাকায় বিএনপির রাজনীতিতে ইশরাকের তৎপরতা বাড়ে। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কর্মসূচি ও আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি তরুণ বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। একপর্যায়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী হন তিনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে লড়াই ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসের বিপরীতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক হোসেন। নির্বাচনে তাপস চার লাখ ২৪ হাজার ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ইশরাক পান দুই লাখ ৩৬ হাজার ভোট।

নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তোলে বিএনপি। ইশরাকের অভিযোগ ছিল, পরিকল্পিতভাবে ফলাফল জালিয়াতির মাধ্যমে তাকে পরাজিত করা হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। নির্বাচনের এক মাসের মাথায়, ২০২০ সালের ৩ মার্চ ফলাফল বাতিল চেয়ে মামলা করেন ইশরাক। নির্বাচনে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে তিনি নির্বাচন কমিশনের গেজেট চ্যালেঞ্জ করেন। মামলায় শেখ ফজলে নূর তাপস, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ আটজনকে বিবাদী করা হয়।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. নুরুল ইসলাম ওই নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে রায় দেন। একই সঙ্গে বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেনকে বিজয়ী ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে শেখ ফজলে নূর তাপসের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার বৈধতাও বাতিল করা হয়। এরপর ইশরাককে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ চেয়ে ২২ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন চিঠি দেয়। তবে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত আসার আগেই রবিবার রাতে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। ২৭ এপ্রিল প্রকাশিত সংশোধিত গেজেটে শেখ ফজলে নূর তাপসের পরিবর্তে ইশরাক হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। এরপর ১৯ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে ঢাকার দুই সিটিসহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসও অপসারিত হন। পরে ওই পদে একজন প্রশাসক দায়িত্ব পালন করেন। এদিকে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের রায় ও নির্বাচন কমিশনের গেজেট প্রকাশের পর ইশরাকের মেয়র পদে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। উপনির্বাচন না দিয়ে আদালতের রায় ও সংশোধিত গেজেটের ভিত্তিতে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করায় তিনি কতদিন মেয়রের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। তবে মেয়র হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের প্রশ্নটি প্রশাসনিক ও আইনি আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে।