১২ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:২১

দিনে-রাতে বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানোর আর্জি জানান: শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ  © সংগৃহীত

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, ‘এখন বড় বড় রাজনৈতিক দল আছে, যাদের বড় বড় নেতারা দিনে রাতে আর্জি করছে যে কত অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়ার নামিয়ে যায়। এই জায়গা থেকে আমি বলি, একটা জ্ঞানভিত্তিক জায়গা থেকে তাদের চাওয়াটা যেন প্রকাশ করতে পারে সেটাও সরকারের দায়িত্ব। একই সাথে আমি মনে করি আজকে আমাদের ডেভেলপমেন্ট পার্টনার; মিডিয়ার ভাই বোনেরা যারা উপস্থিত আছেন, তাদেরও দায়িত্ব, জনগণকে সঠিক তথ্য দেয়া। সঠিকভাবে জানা।’

সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত ‘হার স্কিলস, হার ফিউচার’ (Her Skills, Her Future) শীর্ষক প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিয়ের বয়স নিয়ে ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘কিছুদিন আগে কোন একটা প্রোগ্রামে আমি বলছিলাম জাস্ট আজ থেকে ৪ হাজার বছর আগের লিখিত ইতিহাস থেকে আমরা জানি ইজিপ্টে ম্যারেজ এজ ২০+। আজ থেকে ২৫০০ বছর আগে প্লেটরা যখন আলোচনা করেছে সেসময় গ্রিসে এভারেজ ম্যারেজ এ ছিল ৩০ এর মধ্যে। আজকে ২০২৬ সালে এসে আই রোবটিক্স রুলসের যুগে তখন আমাদের দেশের রাজনৈতিক আলোচনা হলো যে বিয়ের বয়স কত কমিয়ে নিয়ে আসা যায়।’

নারীর টেকসই ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে শুধু পেশাগত প্রশিক্ষণ বা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগদক্ষতা, অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।

তিনি বলেন, ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশক থেকে নারীদের বিয়ের বয়স বাড়ার পেছনে শুধু আইন নয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেরও ভূমিকা রয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নারীদের অংশগ্রহণ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে নারীরা বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা কিশোরী ও তরুণীদের দক্ষতা উন্নয়নের কর্মসূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সমাজে একজন নারীকে তাঁর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য তাঁদের পরিবারকে সম্পৃক্ত করে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে পারলে নারীর ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পথ আরও সুগম হবে।

ববি হাজ্জাজ বলেন, নারীর ক্ষমতায়নকে কেবল একটি সাধারণ ধারণা হিসেবে দেখলে হবে না। ব্যক্তিগত, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করে সেগুলোর সমন্বয়ে কার্যকর কর্মসূচি তৈরি করতে হবে। একজন নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার আগে তাঁর আত্মবিশ্বাস, নিজের অধিকার সম্পর্কে ধারণা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাও জরুরি।

যোগাযোগদক্ষতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, নিজের দক্ষতা ও সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা। একজন নারী তাঁর কাজ, পণ্য বা সেবার গুণাগুণ অন্যের কাছে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারলে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ বাড়ে। তাই নারীদের দক্ষতা উন্নয়নের কর্মসূচিতে যোগাযোগদক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ, সামাজিক চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিবারগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে কাজ করতে হবে। মেয়েদের শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ বাড়ানো গেলে তাঁরা নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সক্ষম হয়ে উঠবেন।

তিনি আরও বলেন, নারীর ক্ষমতায়নে আইনগত সুরক্ষা ও সচেতনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসংস্থান ও আয়মূলক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ তাঁদের পরিবার ও সমাজে অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধসহ নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগগুলোকে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, নারীদের জন্য উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাঁদের বাস্তব প্রয়োজন ও সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া কিশোরী ও তরুণীদের জন্য এমন কর্মসূচি তৈরি করতে হবে, যাতে তাঁরা নিজেদের সক্ষমতা বিকাশের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সহযোগিতাও পান। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি সংস্থা ও গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা কিশোরী ও তরুণীদের শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক পেশাগত ও জীবনমুখী দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করে তোলাই ছিল ‘হার স্কিলস, হার ফিউচার’ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের চিফ অব এডুকেশন দীপা শঙ্করের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ এবং কোইকা বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহুন কিম। অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।