৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৩৫

জাতিসংঘ সফরে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখার অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন  © সংগৃহীত ও টিডিসি সম্পাদিত

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের নিউইয়র্ক সফর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখার পাশাপাশি অংশীদারত্ব, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

মাহদী আমিন বলেন, ‘চার কর্মদিবসের সফরে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ ও সম্ভাবনাকে দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।’

তিনি জানান, চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ ছাড়াও ১১টি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং ছয়টি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ১৫ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীসহ ৩৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল ছিল। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সফরকালে আরও প্রায় ৫০টি বৈঠকে অংশ নেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকের সংখ্যা ৮০ ছাড়িয়েছে।

মাহদী আমিন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে একটি ছোট প্রতিনিধিদল ক্যালিফোর্নিয়াও সফর করে।

প্রধানমন্ত্রীর ৩০টি কর্মসূচির মধ্যে আটটি সরাসরি জাতিসংঘকেন্দ্রিক ছিল। এর মধ্যে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান ও ভাষণ, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত প্রাতরাশ বৈঠক, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান এবং চারটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-ইভেন্ট উল্লেখযোগ্য।

গণতন্ত্র ও উন্নয়নের রূপরেখা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তুলে ধরেন।

তিনি সরকারের ‘থ্রি-আর’—রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন—কৌশলের রূপরেখা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার কার্ড, হেলথ কার্ড এবং প্রস্তাবিত ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর উদ্যোগের কথা জানান।

মাহদী আমিন বলেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা তৈরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সের ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছেন।

‘প্রধানমন্ত্রী একটি সমৃদ্ধ, স্বাবলম্বী ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেছেন, যাতে উন্নয়নের সুফল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়,’ বলেন তিনি।

জলবায়ু ও স্বাস্থ্য

সফরে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাও বিশেষ গুরুত্ব পায়। জলবায়ুবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা মাস্টারপ্ল্যান ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন, সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প উদ্যোগের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জলবায়ু তহবিলে প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে ধাত্রীবিদ্যা ও মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যবিষয়ক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানান। তাঁদের ৮০ শতাংশ নারী হবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাঁচ দফা

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিশেষ অনুষ্ঠানে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে পাঁচ দফা রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি। রূপরেখায় মানবিক সহায়তা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।

বিনিয়োগ-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রীর ১১টি দেশের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সমতা, মর্যাদা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জনশক্তি রপ্তানি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য গুরুত্ব পায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় জনশক্তি রপ্তানি ও বিনিয়োগ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতার বিষয় গুরুত্ব পায়।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, গেটস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক পিস ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা এবং ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

মাহদী আমিন জানান, জাতিসংঘ মহাসচিব প্রধানমন্ত্রীকে সাম্প্রতিক নির্বাচনী জয়ের জন্য অভিনন্দন জানান এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেন। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নিয়েও আলোচনা হয়।

এ ছাড়া ওয়াল স্ট্রিটের ২৫ জনের বেশি শীর্ষ বিনিয়োগকারী বাংলাদেশের আর্থিক খাতে বিনিয়োগ এবং নতুন বন্ড চালুর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির প্রেক্ষাপটে বোয়িংয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের বার্তা

সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ড. জুবাইদা রহমানও আটটি কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং তিনটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। তিনি মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সংবর্ধনা এবং উইমেন লিডার্স প্ল্যাটফর্মসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আয়োজনে অংশ নেন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ কী বার্তা দিয়েছে—এ প্রশ্নের জবাবে মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা এবং আত্মনির্ভরশীল, আধুনিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকার কথাও স্পষ্ট করেছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন যে বাংলাদেশ সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা চায়। একইসঙ্গে তিনি আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।’

মাহদী আমিন বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর সফরের মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থ ও সম্ভাবনাকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা।

‘প্রধানমন্ত্রী যেখানেই গেছেন, সেখানেই দেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। আমরা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য বাড়াতে চাই। যেন আত্মনির্ভরশীলতা, অর্থনৈতিক শক্তি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারি,’ বলেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার মাহফুজুর রহমান, উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু, উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা, সহকারী প্রেস সচিব শাহরিয়ার পামির এবং সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক উপস্থিত ছিলেন।