১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৯

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি করলে ছয় মাসের দণ্ড

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়  © সংগৃহীত ছবি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বন্ধে নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত আইনে কোনো শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন এবং দোষী ব্যক্তির ছাত্রত্ব স্থগিত, বহিষ্কার কিংবা চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ আইনের খসড়া প্রস্তুত করেছে। খসড়া অনুযায়ী, সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, মক্তব, একাডেমি, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও কোচিং সেন্টার এ আইনের আওতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হবে।

প্রস্তাবিত আইনে অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক, মৌখিক ও অমৌখিক আচরণকে যৌন হয়রানি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কোনো আচরণ যদি কারও জন্য অনিরাপদ, হুমকিস্বরূপ, অস্বস্তিকর, বিব্রতকর বা অপমানজনক হয়, তাহলে সেটিও যৌন হয়রানির আওতায় পড়বে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির মধ্যে থাকবে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আবেদন, শারীরিক স্পর্শ বা স্পর্শের চেষ্টা, যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চাপ দেওয়া, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বা মন্তব্য, অশালীন ভঙ্গি, উত্ত্যক্ত করা এবং কাউকে অনুসরণ করা। এ ছাড়া যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় ঠাট্টা-উপহাস, পর্নোগ্রাফি দেখানো বা যৌন সুযোগ পাওয়ার জন্য অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়াকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

শুধু সরাসরি আচরণ নয়, চিঠি, ফোন, মোবাইল, এসএমএস, ছবি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেও যৌন হয়রানি করলে তা আইনের আওতায় আসবে। শ্রেণিকক্ষ, বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল, নোটিশ বোর্ড, বাথরুমের দেয়ালসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্থানে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা অপমানজনক কিছু লেখা কিংবা ছবি প্রকাশ করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

এ ছাড়া ব্ল্যাকমেইল বা চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে কারও ছবি ধারণ, যৌন আপত্তিকর বার্তা পাঠানো, অশালীন মন্তব্য করা, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় হুমকি বা চাপ দেওয়া এবং ভয় দেখিয়ে বা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করলেও শাস্তির বিধান থাকবে। এসব কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক বা শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করাও যৌন হয়রানি হিসেবে বিবেচিত হবে।

প্রস্তাবিত আইনে যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তের জন্য কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযুক্ত শিক্ষার্থী বা শিক্ষককে সতর্ক, তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করতে পারবে। শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছাত্রত্ব স্থগিত বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করার সুপারিশও করতে পারবে কমিটি।

অভিযুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারীর ক্ষেত্রে পদোন্নতি স্থগিত, বেতন বৃদ্ধি বন্ধ, পদ বা স্কেলের নিচের ধাপে নামিয়ে দেওয়া, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরিচ্যুতি বা অব্যাহতির মতো শাস্তির সুপারিশ করা যাবে। তদন্ত কমিটিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।

কমিটির সুপারিশ ৩০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন না করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এ ক্ষেত্রে আদালত অর্থদণ্ড, সর্বোচ্চ দুই মাসের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ড দিতে পারবেন।

যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর শারীরিক নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা, মর্যাদা ও পরিচয় গোপন রাখার ব্যবস্থাও থাকবে।

এদিকে মিথ্যা যৌন হয়রানির অভিযোগ করলেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তদন্তে কোনো অভিযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমেও যৌন হয়রানি করলে তা আইনের আওতায় আসবে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌন আপত্তিকর বার্তা, ছবি বা মন্তব্য পাঠালেও শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।

নতুন আইনটির খসড়া নিয়ে সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, ভারত ও কানাডার মতো দেশের আইন পর্যালোচনা করে খসড়াটি আরও কার্যকরভাবে তৈরি করা প্রয়োজন। তার মতে, বর্তমান খসড়ায় কিছু বিষয় আরও স্পষ্ট করা দরকার।