এত এত মেধাবী থাকার পরও আমাদের ইউনিভার্সিটিগুলোর র্যাংকিংয়ের এ অবস্থা কেন?
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষক-শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান না পাওয়ার অন্যতম কারণ গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি। তার মতে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
আজ রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) ‘স্টেম ফর আ ফিউচার-রেডি বাংলাদেশ: বিল্ডিং দ্য ব্যাকবোন অব দ্য ইনোভেটিভ ইকোনমি’ শীর্ষক প্লেনারি আলোচনায় ‘ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া কোলাবোরেশন’ পর্বে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সীমাবদ্ধতা যদি না থাকে তাহলে এত এত মেধাবী মানুষ থাকার পরেও আমাদের ইউনিভার্সিটিগুলোর র্যাংকিংয়ের এ অবস্থা কেন? তার মানে এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হয় নাই। আমাদের রিসার্চ কালচার নাই।’
মাহদী আমিন বলেন, বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের আয়ের বড় একটি উৎস অ্যালামনাইদের এনডাওমেন্ট, গ্রান্ট কিংবা তাদের কোম্পানিগুলোর সিএসআর। তিনি নিজে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, সেই কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতেও প্রতিবছর অ্যালামনাইদের নিয়ে বিভিন্ন আয়োজন হয় এবং সেখানে অনুদানের জন্য আহ্বান জানানো হয়। কোথাও কোনো ফান্ডিংয়ের প্রয়োজন হলে অ্যালামনাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অ্যালামনাইদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা সফল উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হয়েছেন, তারা নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহজেই বিভিন্ন ধরনের ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া সহযোগিতা তৈরি করতে পারেন।
ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া সহযোগিতার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রগুলোর একটি গবেষণা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে শিল্প খাতের প্রতিটি স্তরে গবেষণার সংস্কৃতির ঘাটতি রয়েছে। কারণ দেশের প্রযুক্তিগত পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে আমরা মূলত ভোক্তা, সৃষ্টিকারী নই। ফলে গবেষণানির্ভর কোম্পানির সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম।
মাহদী আমিন বলেন, শিল্প খাতে গবেষণার সংস্কৃতি কম থাকলে একাডেমিয়া থেকেও গবেষণার চাহিদা কম তৈরি হয়। এটি হলো ডিমান্ড সাইড। অন্যদিকে সাপ্লাই সাইডে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার জন্য সেভাবে সক্ষম করে তোলা হয়নি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নাল অ্যাক্সেস নেই, কোথাও ইন্টারনেট সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। অবকাঠামোগত ও ল্যাব সুবিধার ঘাটতির পাশাপাশি বৈশ্বিক গবেষণা ও উন্নয়ন, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর এবং জার্নাল প্রকাশনার ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার সংস্কৃতি কীভাবে তৈরি করা যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও উদ্যোক্তা পর্যায়ে কীভাবে বাংলাদেশে আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ ও বিদেশি কোম্পানির গবেষণা কার্যক্রম আনা যায়, সেটিকে সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। শিল্প খাতের দিক থেকে ডিমান্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে সাপ্লাই দুই জায়গাতেই কাজ করতে হবে। তাহলেই জাতীয় পর্যায়ে গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
মাহদী আমিন আরও বলেন, ‘নো ডাউট’ বাংলাদেশে অনেক ভালো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী রয়েছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে গবেষণার মানসিকতা তৈরি করা যায়নি। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী অনার্সে ভালো ফল করার পর বিদেশে গিয়ে মাস্টার্স ও পিএইচডি করে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো গবেষণা ও প্রকাশনা করছেন। অথচ দেশে থাকা অবস্থায় সেই সুযোগ পাননি। অর্থাৎ সমস্যা মেধায় নয়, সমস্যা সুযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে।
শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা বা অন্যান্য বিভাগীয় শহরে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধানে যুক্ত করতে হবে। কোনো এলাকায় হাইটেক পার্ক, ইনোভেশন পার্ক, অর্থনৈতিক অঞ্চল বা বিসিক থাকলে সেখানকার ব্যবসায়িক সমস্যাগুলো স্থানীয় বা কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয় ও তৃতীয় স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গবেষণার মাধ্যমে সমাধান করতে পারে কি না, সে ধরনের একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে।
সরকারের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে মাহদী আমিন বলেন, সরকার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং এ নিয়ে কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আরও বলেন, বাংলাদেশের বড় সুবিধা হলো দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। তাদের মেধা ও সক্ষমতা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশে ব্যবসারও ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। ১৮ কোটির বেশি মানুষের দেশে এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির কারণে এখানে সবসময়ই ব্যবসার সুযোগ থাকবে।