১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৩৪

নতুন নামে এলো র‌্যাব

জাতীয় সংসদ  © ফাইল ফটো

বিরোধী দলের নানা আপত্তি ও সমালোচনার মধ্যেই বহুল আলোচিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে এ আইনে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিলটি কণ্ঠভোটে দিলে তা পাস হয়।

এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তা সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। বুধবার কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উত্থাপন করা হলে বিলটির বিভিন্ন ধারার ওপর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সাতটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি জানানো হয়। তবে সংসদীয় কমিটির সুপারিশসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করলে বিরোধীদলীয় নেতাসহ অন্যান্য বিরোধী সদস্য এর তীব্র বিরোধিতা করেন।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, র‌্যাব বিলুপ্ত করে কেবল নতুন নামে একই ধাঁচের বাহিনী গঠন জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণ করবে না। তাই কোনো অবস্থাতেই এই আইন পাস করা উচিত নয়।

বিরোধী দলের সদস্যরা তাদের আপত্তিতে বলেন, র‌্যাব বিলুপ্তির পর পর্যাপ্ত জাতীয় পরামর্শ এবং শক্তিশালী ও স্বাধীন জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে এসআরবি শেষ পর্যন্ত র‌্যাবেরই নতুন রূপ ধারণ করতে পারে। এজন্য রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার দাবি জানান তারা।

বিশেষ করে র‌্যাবের পুরোনো নথি, গুমের আলামত ও রেকর্ডপত্র সরাসরি স্থানান্তরের আগে আলাদা তালিকা তৈরি ও সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়, যাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট বা পরিবর্তন না হতে পারে।

যেভাবে গঠিত হবে এসআরবি
পাস হওয়া আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। এর সদর দপ্তর হবে ঢাকায়। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে ইউনিটটি গঠন করা হবে।

বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন একজন মহাপরিচালক। তিনি পুলিশ বাহিনীর অন্তত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা হবেন। মহাপরিচালক বাহিনীর প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা পরিচালনা করবেন।

যেসব দায়িত্ব পালন করবে
আইনের ১০ ও ১২ ধারায় এসআরবির মূল দায়িত্ব ও ক্ষমতার পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ, গুম, ভূমিদস্যুতা, মানবপাচার ও মাদক দমনে বাহিনীটি কাজ করবে।

অপরাধীদের গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও আলামত জব্দের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করতে হবে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তি বা জব্দ করা আলামত এসআরবির নিজস্ব হেফাজতে রাখা যাবে না। আইন অনুযায়ী তা অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

এসআরবির সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আদালত, সরকার বা পুলিশ প্রধানের নির্দেশনায় এসব অপরাধের আনুষ্ঠানিক তদন্ত পরিচালনা করতে পারবেন।

সদস্যদের জন্য শাস্তির বিধান
বিলে বাহিনীর সদস্যদের জন্য কঠোর শৃঙ্খলা ও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলা, মদ্যপ অবস্থায় থাকা, বেআইনি দখলদারি, হেফাজতে থাকা ব্যক্তির ওপর নির্যাতন বা বলপ্রয়োগ, প্ররোচনা দেওয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ অমান্য করাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রমাণ সাপেক্ষে এসব অপরাধের জন্য বরখাস্ত, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর বা বেতন-ভাতা বাজেয়াপ্তের পাশাপাশি তিরস্কার ও জরিমানার মতো শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা ব্যক্তিগত অভিযোগ বা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ নিরসনে একটি বিশেষ ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠন করা হবে।

র‌্যাবের সম্পদ যাবে এসআরবিতে
আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিলে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে অপরাধের বৈচিত্র্যময় রূপ ও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে—এমন আধুনিক ও দক্ষ বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। র‌্যাব বিলুপ্তির মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিমূলক আধুনিক বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে এসআরবিকে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

আইনটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র‌্যাব-সংক্রান্ত আগের সব বিধান বাতিল বলে গণ্য হবে। একই সঙ্গে বিলুপ্ত র‌্যাবের সব সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, তহবিল ও নথি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসআরবির কাছে ন্যস্ত হবে।