সরকারি চাকরির লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বরও কমছে, ভাইভায় বাড়ছে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত
সরকারি চাকরির তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির (১১-২০ গ্রেড) পদে নিয়োগ বিধিমালায় বড় পরিবর্তন আনছে সরকার। নতুন বিধিমালায় গ্রেডভেদে লিখিত ও মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষার নম্বর পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটি’র বৈঠকে ‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাগুলোর ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মানবণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। বর্তমানে এসব পদে ভাইভায় ১০ নম্বর থাকলেও নতুন প্রস্তাবে গ্রেডভেদে তা ২৫, ৪০ ও ৫০ নম্বর করার কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে ১১ ও ১২ গ্রেডের পদে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ছে ৪০০ শতাংশ। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৯০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় পাস করতে ৫০ শতাংশ নম্বর প্রয়োজন হলেও নতুন বিধিমালায় তা কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন প্রস্তাবে লিখিত পরীক্ষায় ৬০ এবং ভাইভায় ৪০ নম্বর রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে ১৭ থেকে ২০ গ্রেডের পদে বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় ৪০ এবং ভাইভায় ১০ নম্বর রয়েছে। প্রস্তাবিত বিধিমালায় লিখিত ও মৌখিক—দুই পরীক্ষায় ২৫ নম্বর করে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
১৩ থেকে ১৬ গ্রেডের পদে বর্তমানে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় যথাক্রমে ৯০ ও ১০ নম্বর রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে লিখিত পরীক্ষায় ৬০ এবং ভাইভায় ৪০ নম্বর রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে ১৭ থেকে ২০ গ্রেডের পদে বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় ৪০ এবং ভাইভায় ১০ নম্বর রয়েছে। প্রস্তাবিত বিধিমালায় লিখিত ও মৌখিক—দুই পরীক্ষায় ২৫ নম্বর করে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে ১ থেকে ১০ গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগ হয় সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে। আর ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের নিয়োগ হয় মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়োগ বিধিতে।
নতুন বিধিমালায় কারিগরি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও পৃথক বিধান রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাকে ব্যবহারিক পরীক্ষায়ও পাস করতে হবে। লিখিত ও ব্যবহারিক—দুই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই তিনি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে তাকে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হবে না।
তবে প্রস্তাবিত বিধিমালা শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, আনসার ব্যাটালিয়ন, কোস্ট গার্ড, র্যাব বা অন্য কোনো বাহিনী এবং সরকারি কর্ম কমিশনের আওতাভুক্ত কোনো পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
বর্তমানে সিভিল প্রশাসনে সরকারি কর্মচারীদের পদ আছে প্রায় ২০ লাখ। এর মধ্যে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সোয়া ১৩ লাখ। অর্থাৎ নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে সিভিল প্রশাসনের ৬৫ শতাংশ নিয়োগ প্রভাবিত হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলছে, এসব পদে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য প্রার্থীর চাকরি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের লক্ষ্যে বিদ্যমান পরীক্ষার নম্বর বণ্টনে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
এদিকে, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিসিএস পরীক্ষার ভাইভা আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত করতে যেখানে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হয়েছে, সেখানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিভিল প্রশাসনে সরকারি কর্মচারীদের পদ আছে প্রায় ২০ লাখ। এর মধ্যে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সোয়া ১৩ লাখ। অর্থাৎ নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে সিভিল প্রশাসনের ৬৫ শতাংশ নিয়োগ প্রভাবিত হবে।
বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকারি চাকরির নতুন খসড়া বিধিমালায় ভাইভায় নতুন মার্কিং সরকারের কাছে ‘বেটার’ মনে হয়েছে বলেই বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে নিয়োগ পরীক্ষার মৌখিক পরীক্ষায় (ভাইভা) বেশি নম্বর রাখার সিদ্ধান্তকে নিয়োগের মানোন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলেও জানেয়েছেন তিনি।
ভাইভায় বেশি নম্বর রাখার ফলে লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া প্রার্থীকে পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, সাংবাদিকের এমন যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ভাইভা যেহেতু সাবজেক্টিভ, তাই সেখানে কারসাজি বা পছন্দের কাউকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি এ বিষয়ে তিনি দ্বিমত করছেন না।
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, চাকরির জন্য শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। একজন প্রার্থীর অন্যান্য যোগ্যতা ও অ্যাপটিটিউডও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তবে কোনো নিয়োগের পর সুনির্দিষ্ট অনিয়ম বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গণমাধ্যমকে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হলে তা অবশ্যই ঠেকানোর চেষ্টা করতে হবে।
এ সময় লিখিত ও ভাইভায় একজন প্রার্থী কত নম্বর পেয়েছেন, তা প্রকাশের বিধান করা যায় কি না, সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের উত্তরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার আশ্বাস দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আমি এই ব্যাপারে আলাপ করতে পারি।