চার ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়নের ইঙ্গিত, শুরুতেই বাড়তে পারে ৩০ শতাংশ
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেল একবারে নয়, চার ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি ও বাজেটের ওপর চাপ কমাতে দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার সুপারিশ করতে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে শুরুতেই মূল বেতন ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে।
আজ সোমবার (৩১ আগস্ট) নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নসংক্রান্ত এসব সুপারিশ অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার সামনে উপস্থাপন করার কথা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার ভিত্তিতেই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি অর্থনীতির ওপর চাপ সামলাতে এ পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মূল বেতনের প্রথম ৩০ শতাংশ ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হতে পারে। এরপর আগামী বছরের শুরু থেকে আরও ৩৫ শতাংশ কার্যকর করার সুপারিশ থাকতে পারে। মূল বেতনের অবশিষ্ট অংশ পরবর্তী অর্থবছরের জুলাই থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এরপর ওই অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ভাতা বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চূড়ান্ত খসড়ায় কমিশনের সুপারিশের তুলনায় বেতন বৃদ্ধির হার কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি। দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি এর আওতায় আসবেন।
তবে এই কাঠামো বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান। বেতন কমিশনের হিসাবে পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। রাজস্ব আয়ের ওপর চাপ, উচ্চ আমদানি ব্যয় ও বাজেট ঘাটতির বাস্তবতায় সরকার একবারে পুরো বেতন বৃদ্ধি না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন কাঠামোতে মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও পুরো অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করা হবে না। প্রথম ধাপে মূল বেতন সমন্বয় করা হবে। পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন ভাতা সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে।
বর্তমানে সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের বেতন-ভাতায় সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলে এ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
এ কারণে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এই বরাদ্দ ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির কারণে গত এক দশকে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় অনেকটাই কমে গেছে। নতুন বেতনকাঠামো সেই চাপ কমাতে সহায়ক হবে। বেতন বাড়লে সরকারি কর্মচারীদের ভোগব্যয়ও বাড়তে পারে। এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতন বৃদ্ধি সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ালেও সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও বাজেট ঘাটতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে। তাই বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
এর আগে গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার জানিয়েছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। যেকোনো সময় এটি ঘোষণা করা হতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
গত ২৯ জুলাই অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে দ্রুত তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারির কার্যক্রম শুরু হবে বলেও তিনি জানান।