২২ আগস্ট ২০২৬, ১৯:২১

মতিঝিল আইডিয়াল থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হওয়া কে এই লিংকন?

মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে রাজনীতিতে এসে এবার ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির রাজনীতিবিদ ও গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। গতকাল শুক্রবার (২১ অগাস্ট) বঙ্গভবনে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি। তার নিয়োগের পর থেকেই রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি শিক্ষাজীবন, ধর্মীয় জ্ঞান ও মতাদর্শ নিয়েও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কে এই শামীম কায়সার লিংকন, কী তার শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক পরিচয়—এসব নিয়েই এখন কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিমন্ত্রী লিংকন ১৯৯৫ সালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও ১৯৯৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে রাজধানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে বিবিএ এবং ২০০৬ সালে এমবিএ শেষ করেন।

এরপর মালয়েশিয়ার আইআইএফ থেকে আইসিটিতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। পরে এনআইআইটি থেকে ২০০০ সালে দুই বছর মেয়াদের ‘নেটওয়ার্ক ফাইন্যান্স অ্যান্ড এমআইএস’ এ ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন তিনি। বর্তমানে মালেশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানে পিএইচডিতে অধ্যয়নরতও রয়েছেন এই প্রতিমন্ত্রী। তবে তিনি ইসলাম ধর্ম সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেননি বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক জীবনে মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন ২০০৬ সালের উপনির্বাচনে গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। তাঁর বাবা মোত্তালিব আকন্দ একই আসন থেকে ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর ওই আসনের উপনির্বাচনে লিংকন নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গতকাল তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।

তার ধর্মীয় শিক্ষা ও ইসলামি বিষয়ে জ্ঞানের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠন। তবে তার ধর্মীয় জ্ঞান ও যোগ্যতার প্রশংসা করে ভিন্নমতও জানিয়েছেন কয়েকজন।

গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সম্মিলিত উলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশ। ইসলামি কৃষ্টি-কালচার, শিক্ষা ও ধর্মীয় বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং দেশের আলেম সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে এ দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান তারা।

সংগঠনটির দাবি, শামীম কায়সার লিংকন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মতাদর্শ ও চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নন। তাদের অভিযোগ, তিনি পীর-মাশায়েখ, তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম ও চার মাজহাবের বিরোধী এবং লা-মাজহাবি আকিদায় বিশ্বাসী। এ কারণে তাকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর পদে মেনে নেওয়া সম্ভব নয় বলেও জানানো হয়। তাদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যগতভাবে হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে আসছে।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর তাকে নিয়ে সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছে রাজনৈতিক দল হেফাজতে ইসলাম। গত শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে শামীম কায়সার লিংকনের নিয়োগের বিষয়ে দেশের আলেম-উলামা ও তাওহীদি জনতার পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়। 

বিবৃতিতে শামীম কায়সার লিংকনের মতাদর্শ নিয়েও আপত্তি জানায় হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির দাবি, তিনি দেশের প্রচলিত পীর-মাশায়েখ, তাবলিগ জামাত এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত চার মাযহাবের চেতনাবিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসী।

অবশ্য তাঁর মন্ত্রিত্ব পাওয়া নিয়ে প্রশংসা করেছেন জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রার্থী ড. ফয়জুল হক। তিনি ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘একজন ভদ্র, সজ্জন, ইসলামিক জ্ঞানসম্পন্ন এবং আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে শামীম কায়সার লিংকন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন—এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বিষয়। আমার জানা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী- ধর্মীয় জ্ঞান, আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উচ্চতর ডিগ্রি এবং বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তিনি একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়নে, ধর্মীয় বিশ্বাস, জ্ঞান ও আমলদারির ক্ষেত্রে শামীম কায়সার লিংকন দেশের অনেক কথিত ধর্মীয় নেতা ও পীরের তুলনায় যথেষ্ট যোগ্য ও ব্যতিক্রমী একজন ব্যক্তি। এটি কোনো অন্ধ রাজনৈতিক সমর্থন থেকে বলা নয়; বরং তাঁকে কাছ থেকে দেখা এবং তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয়ের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।’

ইসলামি বক্তা ও আহলে হাদিস/সালাফি ধারার আলেম হিসেবে পরিচিত শায়খ আকরামুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘মাননীয় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী জনাব শামীম কায়সার লিংকন (হাফি:) মহান আল্লাহ তা’আলা আপনার অগ্রযাত্রাকে সহজ ও কল্যাণময় করুন। দেশ ও জাতির কল্যাণে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার শক্তি ও তাওফীক্ব দান করুন। পাশাপাশি কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিশুদ্ধ দ্বীনের দাওয়াতকে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে কবুল করুন। আল্লাহ তা’আলা আপনার সকল নেক প্রচেষ্টা কবুল করুন এবং উত্তম প্রতিদান দান করুন।’