রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আবারও মন্ত্রিসভায় ড. মঈন খান
বিএনপির রাজনীতিতে মার্জিত, যুক্তিনির্ভর ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা হিসেবে পরিচিত এক সময়ের শিক্ষক ড. আব্দুল মঈন খান আবারও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বিএনপি দলীয় এই প্রবীণ রাজনীতিক ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নরসিংদী-২ আসন থেকে বিজয়ী হয়ে সংসদে ফিরেছেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য।
মঈন খানের রাজনীতির সঙ্গে পারিবারিক উত্তরাধিকারও গভীরভাবে যুক্ত। তার বাবা আবদুল মোমেন খান ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের একজন এবং জিয়াউর রহমানের সরকারের খাদ্যমন্ত্রী। তবে মঈন খানের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে ওঠে শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক চিন্তা ও দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে ১৯৭৩ সালে পিএইচডি অর্জন করেন।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নরসিংদী-২ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ১৯৯৬ সালের দুই নির্বাচন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে একই আসন থেকে জয়ী হয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। ২০০৯ সালে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পান। ২০২৬ সালের নির্বাচনেও একই আসন থেকে জয়ী হয়ে আবার সংসদে ফেরেন।
সরকারে মঈন খানের দায়িত্বের অভিজ্ঞতাও দীর্ঘ। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর প্রথমে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং ২০০২ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে নীতিনির্ধারণে তার এই সময়ের ভূমিকা তাকে দলের নীতিনির্ধারক রাজনীতিক হিসেবে আরও পরিচিত করে।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর দীর্ঘ সময় মঈন খান সংসদের বাইরে থাকলেও বিএনপির নীতিনির্ধারণী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে নির্বাচন, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে তার বক্তব্য দলের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে তিনি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও মঈন খানের বক্তব্যে তার রাজনৈতিক দর্শনের একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। তিনি রাজনীতিকে ক্ষমতা ভোগের পরিবর্তে জনগণের সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখার কথা বলেছেন। তার ভাষায়, জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে না পারলে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়।
মঈন খানের রাজনৈতিক অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী রাজনীতির প্রতি তার দৃঢ় সমর্থন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি জিয়াউর রহমানের সময়কার অর্থনৈতিক নীতি, মুক্তবাজারমুখী অর্থনীতি এবং উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কারণে বিএনপির ভেতরে মঈন খানকে শুধু একজন সাবেক মন্ত্রী নয়, দলের নীতিনির্ধারণী ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবেও দেখা হয়। ২০২৬ সালে সংসদে ফেরার পর তাকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছিল—যা তার অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণী অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফলে মঈন খানের রাজনৈতিক যাত্রা একদিকে পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে শিক্ষা ও নীতিনির্ভর রাজনীতির নিজস্ব পরিচয় তৈরির গল্প। তিন দশকের বেশি সময়ের সংসদীয় অভিজ্ঞতা, একাধিক মন্ত্রণালয় পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে দীর্ঘদিনের অবস্থান—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রত্যাবর্তন তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখন তার সামনে চ্যালেঞ্জ হবে পুরোনো অভিজ্ঞতাকে বর্তমান সরকারের নীতি বাস্তবায়নের সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারেন।