সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো কবে থেকে বাস্তবায়ন, যা বললেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থ জোগাড় এবং কবে থেকে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। শিগগিরই মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আরও বলেন, ‘পরিচালন ব্যয়ের ১ নম্বর খাত হিসেবে যখন আবির্ভূত হয়েছে ঋণের সুদ ব্যয়, তখন বাংলাদেশে উন্নয়নের বয়ান প্রচারিত হয়েছে। কেউ বলেছেন উন্নয়ন মিরাকল, কেউ বলেছেন উন্নয়ন প্যারাডক্স। যেদিন খাদ্য আমদানি করা হচ্ছিল, সেদিনও পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে খাদ্য রপ্তানি করা হচ্ছে। এ রকম একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম।’
আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, মিথ্যা তথ্য, অপতথ্য, ভুল তথ্য—এগুলো ছিল এত দিন। এ থেকে উত্তরণের পথ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ করের হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয়ত হচ্ছে ঋণ। ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। এগুলো হচ্ছে ঋণের অর্থে বিনিয়োগের ফল কী হবে, অর্থের সময়মূল্য কী হবে এবং এর তাৎক্ষণিক বহুমাত্রিক প্রভাব কী হবে। ঋণ নেওয়া কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। তবে দেখতে হবে কত সুদে, কার কাছ থেকে, কত দিনের জন্য তা নেওয়া হচ্ছে।
তাহলে কি ঋণ নিয়ে বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ঋণ ছাড়া কি কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চলে? ঋণ কোনো বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে বাজেট-ঘাটতি কত শতাংশ হলো এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) কত শতাংশ কর আদায় হচ্ছে। এ ছাড়া জিডিপির তুলনায় কত শতাংশ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় হচ্ছে। আর নীতিকাঠামো ও রাজস্বনীতি ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারছে কি না এবং সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। তবে এটি কবে থেকে এবং কত ধাপে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরই চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জানান, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বেতনকাঠামো নিয়ে সাধারণত তিনটি পর্যায়ে কাজ হয়। প্রথম পর্যায়ে পে সার্ভিস কমিশন বা সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পে কমিটি এবং বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল পে কমিশন তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে। এসব প্রতিবেদনের মধ্যে প্রথম দুটির বিষয় সচিব কমিটি পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিয়েছে। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের পে-স্কেলের জন্য মন্ত্রিপরিষদ গঠিত একটি কমিটি রয়েছে। ওই কমিটির প্রথম সভাও হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা, বিষয়টির সংবেদনশীলতা এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নিয়ে কমিটি তাদের প্রতিবেদন দেবে। এর মাধ্যমে পে-স্কেল প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শেষ হবে। এরপর তৃতীয় পর্যায়ে মন্ত্রিসভা সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করবে। কোন কোন বিষয় কবে থেকে বাস্তবায়ন করা হবে, সে সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকেই হবে বলে জানান তিনি।
বেতনকাঠামোর সুবিধা সীমিতসংখ্যক সরকারি চাকরিজীবী পাবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বেতনবৈষম্য ও সরকারি-বেসরকারি খাতের বেতনের তুলনা নিয়ে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতের ব্যয় বা বেতন তুলনার ক্ষেত্রে একই ধরনের বিষয়কে একই ধরনের বিষয়ের সঙ্গে তুলনা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বেতন এবং বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। তিতুমীর বলেন, ‘যার কর্ম অনুযায়ী তার ব্যবস্থা’—এই নীতিই বিবেচনায় রাখতে হবে।
বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমার নিশ্চয়তা আছে কি না জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, সরকার এমন দাবি করছে না। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে কার্যকর ও যুক্তিসংগত ব্যবস্থা নেওয়া। বেতনকাঠামোর আর্থিক প্রভাব নিয়ে বক্তব্যে উপদেষ্টা জানান, মূল বেতনভোগী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ এবং পেনশনভোগীসহ অন্যদের যুক্ত করলে এ সংখ্যা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি হতে পারে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যে বড় মাত্রায় বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পে-স্কেল নিয়ে কাজ চলছে।
আবার তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, বেতন কমিশন বাস্তবায়ন হবে কবে এবং কত ধাপে। জবাবে উপদেষ্টা বলেন, কাজ চলছে। মন্ত্রিপরিষদ শিগগিরই সব ঠিক করবে।
আগামী শীতে জ্বালানি খাতে স্বস্তি আসবে
এদিকে জ্বালানি খাতে শীতকালের মধ্যে স্বস্তি আসবে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, শীতকালে জ্বালানি পরিস্থিতিতে স্বস্তি আসবে এবং গ্রীষ্মকালে পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। পাশাপাশি ২০২৯ সালের মধ্যে বড় আকারের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি কার্গো না আসার বিষয়ে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, জ্বালানির কার্গোগুলো না আসার বিষয়টি সবাই জানেন। সেখানে ‘ফোর্স মেজরস’ (অপ্রত্যাশিত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ঘটনা) হয়েছে। ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এ ধরনের ঘটনা নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ। তবে এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ওপর অভিঘাত বেশি পড়ছে।
অতীতে পর্যাপ্ত মজুত না রাখার বিষয়টি তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, আগে যদি প্রয়োজনীয় মজুত রাখা হতো, তাহলে এ ধরনের ঘটনায় সংকটের মাত্রা এতটা হতো না। এখন সরকার এ পরিস্থিতি দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে। কাতার থেকেও জ্বালানি পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। কাতার বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চায়, তবে তারাও ফোর্স মেজরসের মধ্যে রয়েছে। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে।
উপদেষ্টা বলেন, শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব করলেই হবে না, জ্বালানির ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত মজুত রাখতে হবে। খাদ্যের ক্ষেত্রে চাল ও গমের নির্দিষ্ট পরিমাণ বাফার মজুত রাখার মানদণ্ড রয়েছে। একইভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও মজুতের নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে।
ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক সংকট, সরবরাহে বিঘ্ন বা আকস্মিক পরিস্থিতি তৈরি হলেও যাতে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা না লাগে, সে জন্যই এই মজুতব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি।
দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতির কথাও তুলে ধরেছেন অর্থ উপদেষ্টা। তাঁর মতে, অতীতে গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। একইভাবে দেশের সম্ভাব্য কয়লা সম্পদ ব্যবহারের বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ ছিল না। এখন নতুন করে দেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ব্লক দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বর মাসে অনুসন্ধান ব্লকগুলোর বিষয়ে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বর্তমানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে তৈরি হওয়া সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন উৎস ও বিকল্প পরিবহনপথ বিবেচনা করছে। কাতারের পাশাপাশি অন্যান্য উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কোন উৎস থেকে কী মুদ্রায় জ্বালানি কেনা হবে এবং অর্থায়ন কীভাবে হবে, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে এমন চুক্তি করতে হবে, যাতে দেশের ওপর অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ না পড়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তির ক্ষেত্রেও নতুন নীতির কথা উল্লেখ করেন তিনি। ‘নো পাওয়ার, নো পে’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।