০৫ আগস্ট ২০২৬, ২১:২৬

কপাল পুড়তে পারে অলস, স্থবির ও বিতর্কিত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের

পাঁচ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী  © টিডিসি সম্পাদিত

আগামী ১৭ আগস্ট বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। এ সময়কে সামনে রেখে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের জোর আলোচনা চলছে। সরকার ও দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, ছয় মাসের কর্মদক্ষতা, ভাবমূর্তি এবং দায়িত্ব পালনের মূল্যায়নের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল আসতে পারে। এতে কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বাদ পড়ার পাশাপাশি নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, গত ছয় মাসে মন্ত্রীদের কার্যক্রম নিয়ে সরকারের ভেতরে ও বাইরে পর্যালোচনা চলছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি, প্রশাসনিক দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা এবং সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় ভূমিকা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যেসব মন্ত্রী অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়েছেন বা প্রত্যাশিত কর্মদক্ষতা দেখাতে পারেননি, তাদের বিষয়ে বিশেষভাবে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে ২৪ মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রীর কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন চলছে। সেই মূল্যায়নের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা হতে পারে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং প্রয়োজনে মন্ত্রিসভার আকারও বাড়ানো হতে পারে।

বিএনপি সূত্র জানায়, মন্ত্রী আমলারা ভেবেছিলেন লাল বাতির গাড়িতে চড়ে আরাম আয়েশে দিন কাটাবেন। কিন্তু তাদের সেই ভাবনায় ছেদ পরার সময় এসেছে। ব্যর্থ অলস এবং কাজের চেয়ে বাগাড়ম্বর বেশি করা মন্ত্রীদের গত পাঁচ মাসের প্রতিদিনের আমলনামা এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টেবিলে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই হাতে নিয়েছেন ব্যর্থ মন্ত্রীদের ডানা ছাঁটার। এই ছয় মাসের ডেডলাইনে বড় পলিটিক্যাল সার্জারি করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত একটি অত্যন্ত গোপন স্পেশাল পারফরমেন্স উইং দিন রাত  প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের ডায়েরি নোট করছে; কোন মন্ত্রী কয় ঘন্টা ফাইলে সই করলেন। কোন ফাইল কতদিন আটকে থাকলো। কার কাজের গ্রাউন্ড রেজাল্ট শূন্য। সব এখন পরিস্কার। সবচেয়ে বড় যে রোগটি ধরা পড়েছে তা হলো মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যকার অহমিকা এবং সমন্বয়হীনতা। এক টেবিলে বসেও নাকি হেভিওয়েট মন্ত্রী আর তার প্রতিমন্ত্রী একে অপরের মুখ দেখা দেখি করেন না। ফলে, গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে থাকছে দিনের পর দিন। কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগলিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য ঠিক রাখতেই মন্ত্রিসভার আকার শুধু পুনর্গঠনই করা হবে না বরং বেশ কয়েকজনকে সোজা সাইডলাইনে পাঠিয়ে দেওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।  

জানা গেছে, এই রদবদলের শূন্য স্থান পূরণ করতে এবং প্রশাসনের ভেতরে নতুন রক্তের সঞ্চালন করতে খুব শিগগিরই মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে যাচ্ছেন বেশ কিছু ঝানু এবং হেভিওয়েট মুখ। 

সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি বা স্পিকার পদে নতুন করে কাউকে মনোনয়ন না দেওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান এবং সেলিমা রহমানের নাম সম্ভাব্য মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

এ ছাড়া মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ হিসেবে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান এবং এ বি এম মোশাররফ হোসেন, মাহিদুর রহমান, এরশাদুল্লাহ খান। এছাড়া ঘুরে ফিরে আসছে ব্যারিস্টার নওশাদ জামিরের নাম। একই সঙ্গে ভৌগলিক রাজনীতির ভারসাম্য মিলাতে এবার বড় ধরনের চমক আসতে পারে প্রথম দফায় মন্ত্রী শূন্য থাকা বৃহত্তর নোয়াখালী বেল্টের নেতাদের দুয়েকজনের। তাদের মধ্যে নোয়াখালী অঞ্চলের প্রবীণ নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুবুদ্দিন খোকন, বরকতউল্লাহ বুলু এবং জয়নুল আবেদিন ফারুকের মধ্য থেকে বেছে নেয়া হতে পারে যে কাউকে।

এছাড়া, কৌশলগত কারণে নারায়ণগঞ্জ এবং নরসিংদী থেকে দুজন তরুণ এমপি এবং নেত্রকোনা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে একজন প্রভাবশালী নারী এমপির নাম নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। তবে আসল চমক থাকছে টেকনোক্র্যাট কোটায়। এ তালিকায় বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং আওয়ামী আমলের সবচেয়ে বেশি মামলার শিকার বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেলের। কিন্তু এই নতুন পাওয়ার হাউসকে জায়গা দিতে গিয়ে ঢাকা এবং খুলনা বিভাগের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীদের কপাল পুড়তে পারে।  

এছাড়াও মন্ত্রণালয়ের স্থবিরতা দূর করতে ওভারলোডেড মন্ত্রীর দফতর কমানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যার উপর চেপে আছে তিন তিনটি মেগা প্রজেক্ট সমৃদ্ধ পাহাড়সম মন্ত্রণালয়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় দেশের পুরো যোগাযোগ এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থার চাবি একাই সামলাচ্ছেন শেখ রবিউল আলম। তিনি সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তিন তিনটি বিশাল মন্ত্রণালয়ের কোটি কোটি টাকার ফাইল সই করতে করতে আর কর্মকর্তাদের সাথে রুদ্ধশ্বাস মিটিং করতে করতে আক্ষরিক অর্থেই হিমশিম খাচ্ছেন। তার বিভিন্ন প্রশাসনিক ভুলভ্রান্তি নিয়ে ইদানিং গণমাধ্যমেও তীব্র আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। তিন দিক থেকে সামলাতে গিয়ে কাজের স্বাভাবিক গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। এছাড়াও রয়েছে রাজনৈতিক মেরুকরণ। দলের ভেতরের একটি শক্তিশালী গ্রুপ চাচ্ছে সড়ক কিংবা রেলপথের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে। গ্রিন সিগন্যাল পেতে তারা জোর লবিংও চালাচ্ছেন। 

অন্যদিকে হেভিওয়েট অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে নিয়েও আলোচনা চলছে। তিনি একই অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মতো দুটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলাচ্ছেন।  

সূত্র বলছে, বয়সে প্রবীণ আমির খসরু নিজেই এখন হাঁপিয়ে উঠেছেন এবং তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়টি অন্য কারো হাতে ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ ফোকাস অর্থ মন্ত্রণালয় রাখতে চাইছেন। এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তার দপ্তরেও নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা প্রবল।

এদিকে, স্থবিরতা ও পারফর্মেন্স ঘাটতির খড়ায় আলোচিত হচ্ছেন নূরুল হক নূর, জুনায়েদ সাকি। অতিকথনের কারণে ও শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়ায় শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন নিজের মন্ত্রণালয় হারাতে পারেন। 

সেক্ষেত্রে সরকারের শরিক ও সমমনা দলগুলোর মধ্য থেকেও কয়েকজন নেতাকে মন্ত্রিসভায় নেওয়ার আলোচনা রয়েছে। এ তালিকায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের নাম বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ছয় মাসের এই হানিমুন পিরিয়ড অফিশিয়ালি শেষ আগস্টের দ্বিতীয়ভাগে। রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক সার্জারি ঠিক করে দিবে এই নতুন সরকার আগামী দিনগুলোতে কতটা শক্ত হাতে দেশ চালাবে। ব্যর্থ মন্ত্রীদের ছেঁটে সমন্বয়হীনতা ভেঙ্গে এবং প্রশাসনের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা বিতর্কিত আমলাদের বাদ দিয়ে প্রশাসনকে কতটা পরিষ্কার করা যাবে সেটাই এখন ২৪’র বিপ্লবের মূল স্পিরিট।  

সূত্রগুলোর দাবি, মন্ত্রীদের মূল্যায়নে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে নেওয়া উদ্যোগ, মাঠ প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং জাতীয় সংসদে সক্রিয় অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদে রদবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেখছেন।’