০৪ আগস্ট ২০২৬, ২০:৫৩

দেশ পুনর্গঠনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতি জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান  © সংগৃহীত

দেশপূনর্গঠনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতি জনগণকে সর্তক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আসুন অনেক কথা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, সংগ্রাম হয়েছে, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে…এখন সময় হচ্ছে দেশ পুনর্গঠন করার। এখন সময় হচ্ছে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এখন সময় হচ্ছে ধৈর্য সহকারে ঠান্ডা মাথায় যারা ষড়যন্ত্র করতে চায় তাদের ষড়যন্ত্রের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা, জনগণকে সতর্ক করা। ঠিক একইভাবে আমরা যেই পরিকল্পনা জনগণের সামনে দিয়েছি, আমরা জনগণের জন্য যা করতে চাইছি, দেশকে পুনর্গঠনের জন্য আমরা যা করতে চাইছি সেগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা।

মঙ্গলবার (০৪ জুলাই) জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান। আলোচনা সভায় জুলাই আন্দোলনে শরিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জনগণ এখন চায় আমরা আমাদের বলা কথাগুলো বাস্তবায়ন করি। জনগণ চায় রাস্তায় শান্তি, জনগণ চায় তার সন্তানের শিক্ষার ব্যবস্থা, জনগণ চায় তার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা, জনগণ চায় একটি নিরাপত্তা, জনগণ চায় যে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা অথবা যার যেটা যোগ্যতা সে অনুযায় ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি বাকরি করবে…এটি হচ্ছে জনগণের চাওয়া।

জনগণ একই সাথে জনগণ চায় তার যে রাজনৈতিক অধিকার সেটি যাতে সে তার সময়মত প্রয়োগ করতে পারে।  আমরা গত কয়েকদিন যাবত পত্রপত্রিকায় দেখছি, আমার মনে হয় না কোন গণতন্ত্রের বিশ্বাসী জনগণের কোন সদস্য এরকম কোন কিছু দেশের মধ্যে চায়। আমার মনে হয় আপনারাও আমার সাথে কমবেশি একমতই হবেন। কাজেই আসুন জনগণ যেটি চায় আমরা সেই কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করি।

জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগকারীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই আন্দোলনে আমার নিজের দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল যারা আমাদের সাথে রাজপথে ছিলেন তারাসহ নাম জানা না জানা অরাজনৈতিক বহু মানুষ জুলাই আন্দোলনে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব হয়েছে, সরকারের পক্ষে যতটুকু সম্ভব হয়েছে এবং সামনের দিনে সকলের সরকারের সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু সামর্থ্য অনুযায়ী সম্ভব হবে পরিষ্কারভাবে আমি একটি কথা বলতে চাই, জুলাই আন্দোলনে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আমরা তাদের সাথে আছি। আমরা আমাদের সাধ্যমত এই মানুষগুলোর পাশে থাকব, আমরা আমাদের সাধ্যমত এই মানুষগুলোর ভেতরে যাদের চিকিৎসা প্রয়োজন তাদেরকে আমরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করব, যাদের কর্মসংস্থানের প্রয়োজন ইনশআল্লাহ তাদের জন্য আমরা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব।

একই সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

‘বিএনপি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পথে ধরে রাখতে চায়’

প্রধানমন্ত্রী বলেন,  জিয়াউর রহমান এদেশের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৯১ সাল থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত দেশে খালেদা জিয়ার সময় প্রায় ৮০ হাজার শিল্প কলকারখানা এই দেশে তৈরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কাজেই তাদের সেই দল তাদের সেই পথকেই ধরে রাখতে চায়। এই জন্যই আমরা এমন কাজগুলো করতে চাই যেই কাজগুলোর ফল জনগণ পাবে। শুধু কথা শুনবে না, জনগণ দেখবে যে ইয়েস বিএনপি এই কাজগুলো কর সে জন্য আমি আমার পরিবার আমার সন্তান একটি সেফ পজিশনে আছে, বিএনপি এই কাজগুলো করেছে বলেই আমি আমার পরিবার আমার সন্তান আমরা একটি নিশ্চিত সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের রাজনীতি এটাই হওয়া উচিত। অনেকে অনেক কথা বলবে, সবার সব কথা এত কান দেবার দরকার নেই। আসুন আমরা শপথ করেছি, এই দেশের মানুষের জন্য ডেলিভারি করার, এই দেশের মানুষের জন্য আমরা কাজ ডেলিভার করব। 

তিনি বলেন, এখানে যারা আছেন বিভিন্নজন বিভিন্ন অত্যাচার নির্যাতনের ভিতর দিয়ে আপনারা গিয়েছেন, বিভিন্নজন বিভিন্ন কিছু হারিয়েছেন জীবনে, আমি আমার বাড়িঘর সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি। যেই বাড়ি রেখে আমি চলে গিয়েছিলাম সেই বাড়ি তো আমি দেখিনি। আমরা সকলেই বহু মানুষ বহু কিছু হারিয়েছি। আসুন এখন বোধহয় আমাদের মাইন্ডসেট চেঞ্জ করার একটি সময় চলে এসেছে, পরিস্থিতি চলে এসেছে। আসুন জনগণ আপনাদের পক্ষে রায় দিয়েছে, এখন আমাদের সকলের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের সেই দেওয়া দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করা, সঠিকভাবে সততার সাথে আমাদের পালন করা। আমরা কি পাবো সেটি বড় কথা নয়। আমরা কি দিতে পারব দেশ এবং জনগণের জন্য সেটিই হোক আজকের এই জুলাইয়ের আজকের এই আলোচনা সভার শপথ, এটি হোক আমাদের প্রতিজ্ঞতা।

তারেক রহমান বলেন, কয়েকদিন আগে আপনার বাচ্চাদের এই যে খেলা হলো প্রাইমারি স্কুলের প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের ফুটবল খেলা হলো ছেলেদের এবং মেয়েদের। ২২ লক্ষ ছেলেমেয়েরা এটাতে অংশগ্রহন করেছে। ১২ থেকে ১৪ বছর নতুন কুড়ি স্পোর্টস প্রতিযোগিতা হলো….দেখেন আমরা যখন এখানে আলোচনায় বসি আমরা যখন বক্তব্য দেই অনেক অনেক সমস্যার কথা বলে। একটি সমস্যার কথা সবাই বলে। কী সেটা? আমাদের তরুন সমাজ ড্রাগে জড়িয়ে যাচ্ছে,বিভিন্নভাবে মাদক আসক্তিতে জড়িয়ে যাচ্ছে। এখন আপনি কতজনকে চিকিৎসা দেবেন আর কতজনকে আপনি ধরে ধরে জেলে দেবেন? সম্ভব এটা?

তিনি বলেন, তাহলে উপায় বের করতে হবে। এই যে ইয়াং জেনারেশন, আমরা সবাই কিন্তু ওই বয়সটা পার হয়ে এসেছি। কাজে সেটার এক্সপেরিয়েন্স আমাদের আছে। আপনাকে এনার্জি বার্ন করার জন্য একটা ভেনু দিতে হবে। কাজেই আপনি যদি বাচ্চা-মেয়েটাকে আপনি স্পোর্টসের যুক্ত দেন সেখানে সে তার এই এনার্জিটা বার্ন করবে। আপনি যদি সাইন্স ফেয়ারে তাকে এ্যাংগেজ করে দেন সেখানে তার সেই এনার্জিটা বার্ন করবে। আমার ছোটবেলায় গিটার বাজানোর ইচ্ছা ছিল, পিয়ানো বাজানোর ইচ্ছা ছিল। যে কোন কারণে আমি পারি নাই। আপনাদের অনেকের বিভিন্ন ইচ্ছা ছিল, আপনাদের কারো ছবি আকার ইচ্ছা ছিল, আপনি হয়ত শিখতে পারেননি। এরকম লক্ষ কোটি বাচ্চা যাদের মধ্যে যে ইচ্ছাটা আছে আমাদেরকে তাদেরকে সেই সুযোগটা করে দিতে হবে তাহলেই সে খারাপ রাস্তায় না গিয়ে সে ভালো রাস্তায় চলে আসবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেজন্যই আমরা বলতে চাচ্ছি যে লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস। আমরা শিক্ষা কার্যক্রমটাকে সেভাবেই চালাতে সেভাবে ঢেলে সাজাতে চাচ্ছি। এটি হচ্ছে আমাদের জুলাই চেতনা বলেন, স্বাধীনতার চেতনা বলেন বা যেটাই বলেন আমরা এটাতেই বিশ্বাস করি।

কারণ আমি ছোটবেলা থেকে দেখে বড় হয়েছি যেটা সেটা হচ্ছে যে শহীদ জিয়া এভাবেই চিন্তা করতেন দেশের মানুষের জন্য, খালেদা জিয়া এভাবেই চিন্তা করতেন দেশ ও  দেশের মানুষের জন্য। স্বাভাবিক আমিও এভাবেই চিন্তা করব আমার দেশ এবং দেশের মানুষের জন্য।

‘জুলাই আন্দোলনের সাথে আমরা আছি’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই আন্দোলন জনগনের আন্দোলন। জনগন পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই সেই আন্দোলন সফলতা এসেছে।  জুলাই আন্দোলন আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলেছে। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে পরিষ্কারভাবে সাফ বলে দিয়েছি, এই জুলাই আন্দোলনের সফলতার ক্রেডিট এই দেশের সর্বস্তরের জনগণের।এটি কোন একক ব্যক্তি, একক কোনো রাজনৈতিক দলের এটি কোন ক্রেডিট নয়। বিগত ১৭ বছর এই দেশের মানুষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতাকর্মীবৃন্দ সাথে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী আরো অনেকগুলো রাজনৈতিক দল যাদের অনেক নেতৃবৃন্দ আজকে আমাদের এই মঞ্চে বসে আছেন আমরা বিগত ১৭ বছর মাঠে ছিলাম। আমাদের নেতাকর্মীরা বিএনপি হোক তার প্রত্যেকটি অঙ্গ সহযোগী সংগঠন হোক প্রত্যেকটি নেতাকর্মী জনগনকে একা ফেলে মাঠ ছেড়ে আমরা কখনো চলে যায়নি। বাংলাদেশে জুলাই আগস্ট যে সফলতা এসেছে সেটি জনগণ যখন সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে তখন  সেই আন্দোলন সফল হয়েছে। অর্থাৎ জুলাই আগস্টে যে আন্দোলন এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে জনগণের আন্দোলন। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই সেই আন্দোলন সফল হয়েছে। ঠিক যেভাবে  ১৯৭১  সালে বাংলাদেশের জনগণ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র চেয়েছে বলে সেদিন আমাদের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছিল।

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সংস্কার প্রস্তাব এবং পরবর্তিতে শরিকদলগুলো নিয়ে ৩১ দফার সংস্কার প্রস্তাবের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আমাদের বিগত যে নির্বাচনটি আমরা পার হয়ে এসেছি, যে নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষে তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। এই নির্বাচনে আমরা জনগণের সামনে আমাদের ৩১ দফা উপস্থাপন করেছি। এই ৩১ দফা উপস্থাপন করার মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার মাধ্যমে একটি বিষয় আমি মনে করি পরিষ্কার হয়েছে  সেটি হচ্ছে যে যেই সংস্কার প্রস্তাব বা যেই রাষ্ট্র মেরামতের যেই দফাগুলো আমরা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম সেটি দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মাধ্যমে আমরা সর্বপ্রথম উপস্থাপন করেছিলাম সেই প্রস্তাবকেই বিগত নির্বাচনে জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে। 

কাজেই এটি এখন আর বিএনপির কোন ৩১ দফা নয় বরং আমি মনে করি এই ৩১ দফাটা হচ্ছে জনগণের ৩১ দফা। এখন জুলাই জনগণের জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে, জনগণের কাঙ্খিত সেই গণতান্ত্রিক অধিকারও সফলতার পথ ধরে এতদূর পর্যন্ত আজ এসেছে। আমাদের ৩১ দফার মূল লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক যে অধিকার সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করা।

১৭ন ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবার পরে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি-স্বাস্থ্য ব্যবস্থা-বিভাজিত প্রশাসন-পুলিশ প্রশাসনের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা একটি বিধবস্ত ব্যবস্থা পেয়েছি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় জুলাইয়ের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি  আন্দোলনের জুনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম ও ভাসানী জনশক্তি পার্টির সভাপতি শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু ।

বিএনপির মহানগর উত্তর বিএনপির আমিনুল হক, দক্ষিন বিএনপির রফিকুল আলম মজনু, যুব দলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী, কৃষক দলের সভাপতহাসান জাফির তুহিন ও ছাত্র দলের সভাপতি রকিবুল ইসলাম রাকিব বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ,সেলিমা রহমান, এজেডএম জাহিদ হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।