২৩ জুলাই ২০২৬, ১৭:১০

শনিবারের মধ্যে পদত্যাগ করবেন রাষ্ট্রপতি!

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন  © সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন আগামী ২৫শে জুলাইয়ে মধ্যে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করবেন বলে বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে। আর এই পদত্যাগের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অধ্যায়ের অবশেষে সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। 
সূত্র জানায়, সরকারের উচ্চ মহল থেকে রাষ্ট্রপতিকে ইতোমধ্যেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করার কথা। বলা হয়েছে ২৫ জুলাইয়ের আগেই তিনি যেন এই পদত্যাগপত্রে সই করেন। অর্থাৎ এবারের ৫ আগস্টের আগেই দেশ একজন নতুন রাষ্ট্রপতি পেতে যাচ্ছে।  

সম্ভাব্য অনেকের নাম নিয়ে গুঞ্জন থাকলেও বলা হয়েছে শেষ মুহূর্তে যদি সরকার কাউকে তার রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমকেই হয়ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিতে হতে পারে। পরবর্তীতে হয়ত সুবিধাজনক সময়ে সরকার বিচার-বিবেচনা করে নিজেদের সিনিয়র কোনো নেতাকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বিবেচনা করবে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে আসছিলো। পাঁচ আগস্টের মধ্যে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ না করলে, জামায়াত বা সমমনা দলগুলো ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে পারে, সরকারের কাছে এরকম গোয়েন্দা তথ্য আছে। মূলত এ কারণেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্রপতির ব্যাপারে আর ঝুঁকি নিতে চাইছে না। 

নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির সিনিয়র কয়েক নেতা আলোচনায় রয়েছেন। এরমধ্যে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান।

এদিকে, সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন বিবেচনায় দলীয় নেতাদের বাইরে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণিও। তিনি বিএনপি আমলের প্রভাবশালী নেতা ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে রাখে। 

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে পুনরায় চাকরিতে ফিরিয়ে আনে। প্রথমে তাকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। 

তবে, একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে-বিধিসম্মতভাবে নাসিমুল গণির নিয়োগ সম্ভব নয়; মন্ত্রীপরিষদ সচিব চাকুরিরত থাকায় সংসদ সংসদ হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য নন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হতে গেলে তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করার যোগ্যতা থাকতে হয়। সেই বিষয়ে আইনে কী বলে সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। 

এদিকে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছাড়া অরাজনৈতিক কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতির মতো জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দলের জন্য অতীতে সুফল বয়ে আনেনি বলেও বিএনপিতে আলোচনা চলছে। ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দেশের ১৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ছিলেন বিএনপিপন্থি পেশাজীবী সংগঠন জিয়া পরিষদের অন্যতম নেতা। বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার পছন্দে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত হন।

কিন্তু একজন নিরেট ভদ্রলোক শিক্ষক হিসেবে পরিচিত প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগের পর বিএনপিকে তার প্রতিষ্ঠালগ্নের পর সবচেয়ে কঠিন, ভয়াবহ ক্রান্তিলগ্ন পাড় হতে হয়। খালেদা জিয়ার সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আন্দোলন ও বিরোধিতা শুরু করে। 

রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ হওয়ায় প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন সেই বিরোধিতাকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে মোকাবিলা করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেন। ফলে সেই সময় বিভিন্ন অপরাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আর সেই সুযোগে তৎকালীন সেনাপ্রধান মইনুদ্দিন আহমেদ বন্দুকের নলের মুখে ইয়াজউদ্দিনকে দিয়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করাতে সক্ষম হন। 

কারাগারে যান সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, তার দুই পুত্র তৎকালীন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান ও রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাহীন ছোটপুত্র আরাফাত রহমান কোকো। নেমে আসে জিয়া পরিবার তথা সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন। হাজার হাজার নেতাকর্মী দুর্নীতি, সন্ত্রাসীকর্ম কাণ্ডের অভিযোগে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ যৌথবাহিনী ও টাস্কফোর্সের মাধ্যমে আটক ও কারাগারে যান। রাজনীতি থেকে খালেদা জিয়া তথা বিএনপিকে ‘মাইনাস’ করার চেষ্টা হয়। তারেক রহমানের মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙ্গে দেয়া হয়। এক পর্যায়ে দীর্ঘ দেড় যুগের জন্য তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। 

এদিকে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে সে সুযোগ তার আছে, তবে এ বিষয়ে সরকারের কোনো ‘পদক্ষেপ নেই’। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন–এমন গুঞ্জনের মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ে কক্সবাজারের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে এক বৈঠক শেষে বের হওয়ার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।

সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে স্বাস্থ্যগত কারণে বা যে কোনো কারণে, তার সে অপশন আছে। আমরা তো জানি না। এ ব্যাপারে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই দাবি করে সালাহউদ্দিন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হচ্ছে না। আপনারা পত্রিকায় দেখছেন। আর এটা যদি ঘটনা হয় তো আমরাও দেখব।

রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে যেসব গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, সে বিষয়ে আরেক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে, ‘আপনি তো নিজেই বললেন এটি একটি গুঞ্জন। গুঞ্জন তো গুঞ্জনই।’ স্বাস্থ্যগত কারণেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন কি না, সে প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সেটা উনাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে।’

প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের এক ফেইসবুক পোস্ট ঘিরে বুধবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয়। সায়ের ফেইসবুকে লেখেন, ‘আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এর চাইতেও বিস্ময়কর খবর হলো নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতার পরিবর্তে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।’

এ বিষয়ে বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি এখনো আসেনি। তবে রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ একজন বলেছেন, জাতীয় সংসদের স্পিকারকে শিগগির চিঠি লিখবেন রাষ্ট্রপতি। সেখানে ‘পদত্যাগে’র বিষয়টি তিনি তুলে ধরতে পারেন। 

মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ওই বছরের ২৪ এপ্রিল তিনি শপথ নেন। পদত্যাগ না করলে তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা। অবশ্য রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর সরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, ‘আমি বিদায় নিতে আগ্রহী। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।’

কখন পদত্যাগ করতে চান জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, ‘নতুন সরকার আসলে… নতুন সরকার বললে, অনুরোধ করলে।”কেন পদত্যাগের কথা ভাবছেন, সেই প্রশ্নে তার উত্তর ছিল, “আমার ভালো লাগে না।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে কোণঠাসা করে রাখা, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গভবনের প্রেস উইং সংকুচিত করায় ‘অপমানবোধ’ করার কথাও পরে বলেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও রাষ্ট্রপতি তখন পদত্যাগ করেননি। ১৭ ফেব্রুয়ারি তার কাছেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা শপথ নেন।

এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিএনপির সমর্থনের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।’বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় তার পাশে ছিল বলেও দাবি করেন মো. সাহাবুদ্দিন।