নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে বিশাল ব্যয়ের চাপ, বিকল্প যে উৎস খুঁজছে সরকার
পাঁচ বছর পরপর দেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা পর্যালোচনার বিধান রয়েছে। তবে গত ১০ বছরে তা মানা হয়নি। ফলে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের নতুন পে-স্কেল ঘোষণার উদ্যোগকে যৌক্তিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে এর অর্থ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে নতুন সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করতে হলে বাড়তি প্রয়োজন হবে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা।
অর্থের এই বাড়তি চাপ সামলাতে বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার। তবে বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থ সংস্থানের পথ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পে-স্কেল বাস্তবায়নে টাকা ছাপানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন অর্থ ও প্রশাসনিক খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে নবম জাতীয় পে-স্কেলের সুপারিশ জমা পড়ে। সেটি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার।
সূত্র জানায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছিল ৮৫ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা।
নবম পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে পেনশনের পাওনাসহ এ খাতে সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। আগের তুলনায় এ ব্যয় বাড়বে প্রায় ১৫৬ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে সরকারের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি। আগের বেতন কাঠামো অনুযায়ী চলতি বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা।
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে আরও প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হবে। এতে সরকারের মোট বাজেটের আকার ১০ লাখ কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি এবং বড় ঘাটতি বাজেটের মধ্যে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে পে-স্কেলের বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ কারণে বিষয়টি নিয়ে জটিল হিসাব-নিকাশে পড়েছে সচিব কমিটি। ফলে সহসাই পে-স্কেলের চূড়ান্ত অনুমোদনের ফাইল মন্ত্রিসভায় উঠছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব বলেন, পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে হলে টাকা ছাপাতে হবে। এর বাইরে আর কোনো বিকল্প পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, ড. ইউনূস ও ড. সালেহউদ্দিনের নেওয়া কিছু নীতি সময়োপযোগী ছিল না। এর মধ্যে পে-স্কেলের বিষয়টিও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওই সচিব বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণোদনার হার বাড়ানো হোক। কিন্তু সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন একটি পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল দেওয়ার কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টার রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল না। তার দাবি, আমলাদের সন্তুষ্ট করে ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার চিন্তা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
পে কমিশনের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন পুরোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। পে-স্কেল অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এটি বাস্তবায়নের জায়গা থেকে এখন আর ফিরে আসার সুযোগ নেই। তবে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এগোলে দেশ ও জাতির জন্য ভালো হবে।
জানা গেছে, অর্থনৈতিক সংকট থাকলেও সরকার নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে। এসব বিষয় সমাধানে সচিব কমিটিকে কাজ করতে বলা হয়েছে।